Pages - Menu

মলয় রায়চৌধুরী

এই যে, এই ভাবে উদ্দীপক




           আথ্রারাইটিসের পর আর কলম ধরে লিখতে পারি না; যখন পারতুম তখন শব্দ, বাক্য, ছবি ইত্যাদি লিখে রাখতুম ডায়েরিতে, পরে কবিতা বা গদ্যে কাজে লাগাবার জন্য। এখন এক আঙুলে কমপিউটারে টাইপ করে লিখি। তাই আমার এখনকার সব লেখাই খামখেয়াল স্কুল অফ পোয়েটিকস প্রসূত, শীতেল বিদ্যুতের ঝাপট লাগে, কমপিউটারে বসি, লিখতে থাকি; কবিতার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক সিটিঙে। কবিতাটা নিয়ে ভাববার যেটুকু সময় তা হল রাতে স্লিপিং পিল খাবার পর তন্দ্রার মধ্যে ঢুকে পড়ার মাঝে সময়টুকুতে পাওয়া স্মৃতি
        এই যে, এই কবিতাটা, যার শিরোনাম অবন্তিকা তোর ওই মহেঞ্জোদারোর লিপি উদ্ধার”, এটা লেখার উদ্দীপকের কাজ করেছে একজন গণিতবিদ তরুণী কবির সঙ্গে আলাপ। তিনি নামকরা সংস্হার সফ্টওয়্যার ইনজিনিয়ার এবং একই সঙ্গে ইনডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সের ফেলো। তিনি দুটি কবিতা লিখে জানিয়েছিলেন যে সেগুলো আমাকে নিয়ে লেখা। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন যে জনৈক গবেষকের সহায়ক হিসাবে তিনি হরপ্পার অতিপ্রাচীন লিপি উদ্ধারের কাজ করতে চাইছেন। তিনি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন যখন, আমারও তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা উচিত মনে করে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা।
          আমার বড়জ্যাঠা ছিলেন পাটনা মিউজিয়ামের কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার; সেই সুবাদে স্কুলের ছুটি-ছাটায় ওনার সাইকেলের পেছনে বসে চলে যেতুম মিউজিয়াম। প্রবেশ অবাধ ছিল, প্রতিটি ঘরে সারাদিন কাটাতে পারতুম। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর বেশ কিছু নিদর্শন ছিল একটা শোকেসে; শুনে আশ্চর্য লাগত যে কেউই ওগুলোর ইশারা জানেন না। বড়জ্যাঠা বলতেন, “ওগুলো চিঠি, তুই পড়ে বল কী লেখা আছে, চিঠি লিখে সিলমোহর দেগে দেবার ছাপ, অন্য ঘরে যাবার আগে বলে যাবি। বিশ্বাস করতে অসুবিধা হতো না তখন।  
           গণিত সম্পর্কে আমার ভীতি চিরকালের। ইনটারমিডিয়েটে গণিত ছিল যা বাদ দিয়ে ইকোনমিক্সে সান্মানিক স্নাতক পড়তে গিয়ে দেখি গণিত সেখানেও পিছু ধাওয়া করেছে। স্নাতকোত্তরে ইকনোমেট্রিক্সে আমার অবস্হা একেবারে কাহিল; প্রথম হতে পারলুম না। অবশ্য, আমার বন্ধুসঙ্গ আর জীবনযাপনও তার জন্য কিছুটা দায়ি।
         কবিতাও সিন্ধু সভ্যতার অক্ষর আর সিলের মতন, পাঠক ইশারা খোঁজেন আর নিজে নির্ণয় নিতে পারেন, কবি ইশারার কী-কী ইউনিকর্ণ তাতে লুকিয়ে রেখেছেন তাতে পাঠকের বড়ো একটা কিছু এসে যায় না। পাঠক সিলের রহস্যের আহ্লাদে আক্রান্ত হন। ইনডাস স্ক্রিপ্টের কারিগরদের মতন কবিও তাঁর কাজ থেকে উধাও। পাঠক যা ইচ্ছা বুঝুন।
         গণিতবিদ আর সফ্টওয়্যার বিশেষজ্ঞ একজন তরুণী কবি,  আর তিনি সিন্ধু সভ্যতার আড়াই-তিন হাজার বছর আগের লিপি উদ্ধার করতে চাইছেন, স্লিপিং পিলের তন্দ্রায় এটুকু চিন্তাই ছিল বিস্ফোরক; তাঁর প্রতি ভয়-মিশ্রিত অ্যাডমিরেশান কাজ করছিল। উদ্দীপক হিসেবে পরের দিন সকাল থেকে মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল গণিতভীতি, সিন্ধু সভ্যতার ইউনিকর্ণ সিল আর অক্ষরগুলো, বড়জ্যাঠার উপদেশ, তাই নিয়ে বসে পড়লুম কমপিউটারের সামনে। অবন্তিকা একটি নির্মিত প্রতিস্ব। আমার পরিচিতাদের গুণাগুণের আতসকাচের আলোয় গড়া। রামী, বনলতা সেন, নীরা, নয়ন, সুপর্ণার মতন অবন্তিকা কবি-বিশেষের নিজস্ব নয়; তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ আর স্বাধীন। কবিতাটা শেষ পর্যন্ত এরকম দাঁড়ালো :

কী গণিত, কী গণিত, মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে
ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই
কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই
অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ
প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে
কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনী কবি
নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল
মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা
মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই
ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ
আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান
জাস্ট তুমি পিক আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে
সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস
ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ
গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা সিলের সেই বার্তাখানা
হাজার বছর আগে তোর সে পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে
মহেঞ্জোদারোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই
অবন্তিকা, পড়, পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে--
অমরত্ব অমরত্ব ! অবন্তিকা, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে
আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস





কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন