• কবিতা সুর্মা


    কবি কবিতা আর কবিতার কাজল-লতা জুড়ে যে আলো-অন্ধকার তার নিজস্ব পুনর্লিখন।


    সম্পাদনায় - উমাপদ কর
  • ভাবনালেখা লেখাভাবনা


    কবিতা নিয়ে গদ্য। কবিতা এবং গদ্যের ভেদরেখাকে প্রশ্ন করতেই এই বিভাগটির অবতারণা। পাঠক এবং কবির ভেদরেখাকেও।


    সম্পাদনায় - অনিমিখ পাত্র
  • সাক্ষাৎকার


    এই বিভাগে পাবেন এক বা একাধিক কবির সাক্ষাৎকার। নিয়েছেন আরেক কবি, বা কবিতার মগ্ন পাঠক। বাঁধাগতের বাইরে কিছু কথাবার্তা, যা চিন্তাভাবনার দিগন্তকে ফুটো করে দিতে চায়।


    সম্পাদনায়ঃ মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়
  • গল্পনা


    গল্প নয়। গল্পের সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করতে চায় এই বিভাগ। প্রতিটি সংখ্যায় আপনারা পাবেন এমন এক পাঠবস্তু, যা প্রচলিতকে থামিয়ে দেয়, এবং নতুনের পথ দেখিয়ে দেয়।


    সম্পাদনায়ঃ অর্ক চট্টোপাধ্যায়
  • হারানো কবিতাগুলো - রমিতের জানালায়


    আমাদের পাঠকরা এই বিভাগটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারবার। এক নিবিষ্ট খনকের মতো রমিত দে, বাংলা কবিতার বিস্মৃত ও অবহেলিত মণিমুক্তোগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে আনছেন, ও আমাদের গর্বিত করছেন।


    সম্পাদনায় - রমিত দে
  • কবিতা ভাষান


    ভাষা। সে কি কবিতার অন্তরায়, নাকি সহায়? ভাষান্তর। সে কি হয় কবিতার? কবিতা কি ভেসে যায় এক ভাষা থেকে আরেকে? জানতে হলে এই বিভাগটিতে আসতেই হবে আপনাকে।


    সম্পাদনায় - শৌভিক দে সরকার
  • অন্য ভাষার কবিতা


    আমরা বিশ্বাস করি, একটি ভাষার কবিতা সমৃদ্ধ হয় আরেক ভাষার কবিতায়। আমরা বিশ্বাস করি সৎ ও পরিশ্রমী অনুবাদ পারে আমাদের হীনমন্যতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরটি সম্পর্কে সজাগ করে দিতে।


    সম্পাদনায় - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
  • এ মাসের কবি


    মাসের ব্যাপারটা অজুহাত মাত্র। তারিখ কোনো বিষয়ই নয় এই বিভাগে। আসলে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কবিকে নিজেদের মনোভাব জানাতে চাই। একটা সংখ্যায় আমরা একজনকে একটু সিংহাসনে বসাতে চাই। আশা করি, কেউ কিছু মনে করবেন না।


    সম্পাদনায় - নীলাব্জ চক্রবর্তী
  • পাঠম্যানিয়ার পেরিস্কোপ


    সমালোচনা সাহিত্য এখন স্তুতি আর নিন্দার আখড়ায় পর্যবসিত। গোষ্ঠীবদ্ধতার চরমতম রূপ সেখানে চোখে পড়ে। গ্রন্থসমালোচনার এই বিভাগটিতে আমরা একটু সততার আশ্বাস পেতে চাই, পেতে চাই খোলা হাওয়ার আমেজ।


    সম্পাদনায় - সব্যসাচী হাজরা
  • দৃশ্যত


    ছবি আর কবিতার ভেদ কি মুছে ফেলতে চান, পাঠক? কিন্তু কেন? ওরা তো আলাদা হয়েই বেশ আছে। কবি কিছু নিচ্ছেন ক্যানভাস থেকে, শিল্পী কিছু নিচ্ছেন অক্ষরমালা থেকে। চক্ষুকর্ণের এই বিনিময়, আহা, শাশ্বত হোক।


    সম্পাদনায় - অমিত বিশ্বাস

অনুপম বলছি

         
 কেন জানি না, আজ ‘বাক্ ৯০’-এর পরিচালক হিসেবে কিছু লিখতে বসে স্বদেশ সেনকে খুব মনে পড়ছে। কিছুদিন আগে একটি গদ্য লিখেছি তাঁকে নিয়ে। ‘গ্রন্থি’ নামক পত্রিকা অপরিসীম যত্নে সেটি প্রকাশ করেছেন। তারই কিছুটা অংশ, আজ, এখানে...
            বিখ্যাত এবং সাময়িক কবিদের ব্যাপার-স্যাপার যে কোনো দেশকালে মিলে যায়। কিন্তু যে কোনো ভাষায় যে কোনো মহৎ কবির জন্যই কোনো একটি ভিন্ন ট্র্যাজিডি অপেক্ষা করে থাকে। সেটাই তাঁদের সময়কে অতিক্রম করতে সাহায্য করে। তাঁদের বিরাটত্বও সেটা দিয়ে মাপা যায় (যায় কি?)। স্বদেশ সেনও বাংলা ভাষায় তার ব্যতিক্রম নন। তিনি এমন এক সময় তাঁর অবিস্মরণীয় কবিতাগুলো লিখতে শুরু করলেন, বাংলা কবিতা তার আধুনিকের স্বর্ণযুগ পেরিয়ে এসেছে। উত্তর-উপনিবেশের তলানি পচে দুর্গন্ধ উঠতে শুরু করেছে। সেটা ছিল আসর মাত করা কবিদের রমরমার সময়। এই সময় সফল প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু কবিকে কবিয়ালের ভূমিকায় নামিয়ে সেলিব্রিটি বানাতে ইচ্ছুক ছিল। কবিরাও সেটা চাইছিলেন। চিরকাল কিছু কবি অনুগ্রহ চেয়েছেন। আজও চান। কিন্তু রাজার প্রসাদ একজনকে গোপাল ভাঁড়ের পাশে ভারতচন্দ্র বানাতে পারে, মায়ের সামনে রামপ্রসাদ বানাতে পারে না। খবরের কাগজ শাসিত বাংলা কবিতার যে এলাকা, সেখানে আলোর বাড়াবাড়ি। সেখানে ঠাকুর সিংহ, রাম মুচি, যজ্ঞেশ্বরীদের রমরমা। পরিসরটা পুরোপুরি অধুনান্তিক, কিন্তু কবিরা সেটা শনাক্ত করতে পারছেন না।  কবিদের মধ্যে দার্শনিক এবং তাত্বিক দৈন্য প্রকট হয়ে উঠেছে। কেউ পারছেন না পূর্ণ আধুনিকের দিকেও যেতে। নিজেদের আংশিক আধুনিকের উদযাপন করার ক্ষমতাও ফেলেছেন হারিয়ে।
হ্যাঁ পাঠক, স্বদেশ সেনের সঙ্গে তাঁর সমকালীন জনপ্রিয় (?) কবিদের পার্থক্যটা প্রায় একজন রামপ্রসাদ এবং একজন ভোলা ময়রার বলে আমার মনে হয়। স্বদেশ সেনের পক্ষে দাঁড়াকবি হওয়া অসম্ভব ছিল। তিনি অধুনান্তিক একটা পরিসরে বসে একটি শতাব্দীর আধুনিকের শেষ কবি হয়ে উঠলেন। আবার পরবর্তী আধুনিক পরিসরটির দিশারীও হলেন।
সেটা তাঁর পক্ষে সম্ভব হল কী করে?
মহানগর থেকে বহুদূরে এক ছোট শহরে বাসের ফলে কি তা সহজ হল?
স্বদেশ সেন তাঁর নিজের স্বভাব আগলে নিজের চাকরির ছোট শহর জামশেদপুরে একাধিক ছোট কাগজ এবং তাদেরই প্রকাশনা যেমন ‘কৌরব’ এবং ‘কালিমাটি’-কে অবলম্বন করে বাঁচতে চাইলেন, শান্তি চাইলেন। তাঁর জীবনে জামশেদপুর বাসের ব্যাপারটা প্রায় এক স্টিগমাটার মতোই। ‘কলকাতার কবি নন’ ... এই ধারণা স্বদেশ সেন সম্পর্কে ছড়িয়ে থাকল আকাশে বাতাসে বাজারে। কবিতার হার্ড কোর পাঠকরাই তাঁর সম্পর্কে অবহিত। তাঁর নামই বিরল পাঠকরা জানেন। ইন ফ্যাক্ট, স্বদেশ সেনের নাম জানা এবং তাঁর কবিতা পড়া একটা স্ট্যাটাস সিম্বল আজ অনেকের কাছে। সেটা আমি কিছু বন্ধু এবং সমবয়সীর ক্ষেত্রে টের পেয়েছি।
একজন আত্মমগ্ন সাধক কবি। তিনি সার্থকতার পিয়াসী, সফলতার ততখানি নন। এর ফলে জয় গোস্বামীর মতো সফল কবিরা তাঁর খবর রেখেছেন, এমনকি খবরের কাগজে লিখেছেন তাঁকে নিয়ে, কিন্তু যখন এই পরিসরের গুরুত্বপূর্ণ কবিদের প্রসঙ্গ এসেছে, তখন স্বদেশ সেনের নাম সহসা উচ্চারিত হয়নি। এর কারণ তাঁর বৃহত্তর অপরিচিতি। আবার কৌরবের আশ্র্য় তিনি পেয়েছেন, প্রায় এক কুলপতি তিনি সেখানে, এক দ্রোণ। ‘কৌরবের কবি’ – এই পরিচয় কি কোথাও গড়ে উঠেছে? তাঁকে সীমাবদ্ধ করতে চেয়েছে? কিন্তু তাতে তাঁর একা হতে তো আটকায়নি। একজন প্রকৃত আধুনিক কবির মধ্যে আমরা একজন একলা প্রেমিককে পাই। তিনি নিঃসঙ্গ নন। বিচ্ছিন্ন নন। কিন্তু তাঁর চলার পথে মশাল হাতে অন্য কোনো সহযাত্রী মেলে না। স্বদেশ সেনও একলা। বারীন ঘোষাল বা আর্যনীল মুখোপাধ্যায়ের মধ্যে তাঁর প্রভাব আছে, সেই প্রভাবমুক্তি তাঁদের অন্যতম প্রয়াস হয়েছে, কিন্তু তাতে স্বদেশ সেনের কোনো গ্রুপ গড়ে ওঠেনি। বারীন ঘোষাল কথিত সমাজ-নিরপেক্ষ নতুন কবিতা, বা আর্যনীল কথিত সমাজ-নিরপেক্ষ পরিবিষয়ক কবিতার সঙ্গে তাঁর কোনো প্রত্যক্ষ যোগই নেই। তিনি তাঁর জায়গায় একা, এবং একাই। অবিশ্যি তিনি কবিতা না লিখলে বারীন ঘোষাল, স্বপন রায়, রঞ্জন মৈত্র, ইন্দ্রনীল ঘোষ, দেবাঞ্জন দাস, অমিতাভ প্রহরাজ, আর্যনীল মুখোপাধ্যায়, কাজল সেন, নীলাব্জ চক্রবর্তী, শুভ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়রা আজ কী কবিতা লিখতেন, আমার কৌতুহল আছে।
কিন্তু, এঁরা কেউই কি আজ স্বদেশ সেনের মতো লেখেন?
না।
কখনও সরাসরি লিখেছেন?
না।
এবং আমি বলতে চাইব স্বদেশ সেন বাংলা কবিতায় বিশ শতকীয় আধুনিকের শেষ পথিক।
আমি বলতে চাইবো তিনি হতে পারেন একবিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতায় পুনরাধুনিকের অন্যতম এক দিশারী। ঠিক যতটা একজন বিনয় মজুমদার, একজন রমেন্দ্র কুমার আচার্য চৌধুরী।



অনুপম মুখোপাধ্যায়
(পরিচালক বাক্)


অনুপম বলছি

বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার এক বিরাট অভিশাপ হল রবীন্দ্রনাথের কবিতার সাপেক্ষে অন্যান্য দিকপালের কবিতার প্রতি বিদ্যায়তনের ঋজু অবস্থানের অভাব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পেরেছিলেন ব্রিটিশ আধুনিক, ব্রিটিশ রোমান্টিকতা, পদাবলী, এবং উপনিষদের মিলনে এক অপরূপ বাংলা কবিতায় পৌঁছতে। সে এক অন্য আধুনিক। সেখানে শেলি-কীটস এবং জ্ঞানদাস-গোবিন্দদাস এক হয়ে যান। শৃঙ্গাররস এবং ভিক্টোরিয়ান নৈতিকতা সেখানে ঝগড়া করে না। ম্যাথু আর্নল্ড এবং বিদ্যাপতির কোনো বিরোধ নেই সেখানে। ভানু সিংহ হাত রাখেন নিবারণ চক্রবর্তীর কাঁধে।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার বিদ্যায়তনিক তথা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার মধ্যে যত ঢুকবেন, দেখতে পাবেন, তিনের দশকের কবিতাই হয়ে উঠতে চেয়েছে বাংলা কবিতায় আধুনিকের ভিত্তিভূমি। বিদ্যায়তন চেয়েছে তিনের দশকের কবিতাই আধুনিক কবিতার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠুক। সমস্যাটা হল, সে ওই দশকের আধুনিককে হাশিল করতে চেয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘অনাধুনিকতা’ দাবি করে। ছলে-বলে-কৌশলে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হয়েছে, কালের কষ্টিপাথরে রবীন্দ্রনাথ ঠিক ‘আধুনিক’ নন। একজন জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, এমনকি সমর সেনের কবিতায় আধুনিক যেভাবে ধরা দেয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নাকি দেয় না। কবিগুরুর উপনিষদে অধিকার, তাঁর আশ্চর্য আভিজাত্য, ব্রাহ্ম উত্তরাধিকার, নাছোড় রোমান্টিকতা, সর্বোপরি তাঁর পরম আস্তিক্য নাকি আধুনিক কবি হিসেবে তাঁকে মান্যতা পেতে বাধা দেয়। অসংখ্য মূল্যবান প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা হয়েছে। অসংখ্য বই। কিন্তু, সভয়ে বলছি, তাঁর অন্যান্য দিকে পর্যাপ্ত আলোকপাত হলেও, আবু সায়ীদ আইয়ুব, নীরদ সি চৌধুরী, এবং কিছুটা শঙ্খ ঘোষ ছাড়া আর কেউ রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথের নিজের আধুনিকের ধারণায় পরখ করতে সচেষ্ট হননি গত ৫০ বছরে। বরং শিবনারায়ণ রায়ের মতো একজন বিদগ্ধ মানুষও তাঁর প্রবন্ধে গ্যেটের সঙ্গে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথকে হেয় করেছেন, তাঁর সাহিত্যে রক্তমাংসমলমূত্রের অভাবই যেন রবীন্দ্রনাথকে প্রতিবন্ধী করেছে আধুনিকের দরবারে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিপুত্রটি যে কিছুতেই মানুষের বিছানা এবং টয়লেটটাকে দেখাতে চান না, কিছুতেই সত্য-শিব-সুন্দরে বিশ্বাস হারাতে চান না, এটাই যেন পর্যাপ্ত কারন তাঁর প্রতি ঘোর অবিশ্বাস রাখার।
সেটা স্বাভাবিক ছিল কি? হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যজীবনের সোনাঝরা পর্বটা কাটিয়েছেন দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের আগে। সেই পরিসরটা অন্য ছিল। সেই পরিসরের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে খারাপ লোকেরা ছিলেন, কিন্তু শয়তানরা ছিলেন না। নেপোলিয়নের স্মৃতি ছিল, কিন্তু হিটলারের অভিজ্ঞতা নয়। লর্ড ক্লাইভের কাহিনি ছিল, কিন্তু মুসোলিনির নয়। সেখানে প্রাকৃতিক মন্বন্তর ছিল, মানুষের হাতে তৈরি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ছিল না যেখানে মানুষের হাড় দিয়ে বানানো হবে সিগারেট হোল্ডার। মানুষ যে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, ঈশ্বর যে তাঁর নিজের অবয়ব দিয়েছেন মানুষকে, মানুষের উপরে কোনো সত্য থাকতে পারে না... দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ এসে সেই ধারণাকে চুরমার করে দিয়ে চলে গেল। একটা নীল গ্রহ যেন তার সবটুকু আস্থা নিয়ে তলিয়ে গেল। সেই গ্রহের বিরাট একটা অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সর্বস্ব রেখেছিলেন। এর ফলেই রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বাস করা চুরমার দুনিয়ার পক্ষে মুশকিল হল, বিভিন্ন পশ্চিমী দেশে যুদ্ধকাতর পাঠকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা কমে গেল, বইয়ের বিক্রি লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পেল। আইনস্টাইন, চ্যাপলিন, আঁদ্রে জিদ, রমাঁ রলা, ব্রেশট, হারমান হেসের মতো চিরকেলে লোকেরা তাঁর সুনাম করলেও, এমনকি লোরকা, বুনুয়েলের মতো দুর্দমদের কাছে তাঁর সমাদর হলেও, রিলকে, টমাস মান, কাফকার মতো সাহিত্যিকের কাছে তাঁর ‘অচল’ আশাবাদের কোনো মর্য্যাদা হল না। আন্তর্জাতিক সময়টা কিন্তু রিলকে, মান আর কাফকারই অনুগত ছিল।
আমাদের এখানেও সময়ের ধারণা এসে দাঁড়াল রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বিচারের মাঝখানে। তিনের দশকের কবিরা এসে পড়লেন আন্তর্জাতিক সময়ের প্রতি তাঁদের আনুগত্য নিয়ে, আন্তর্জাতিক কবিতার গতি তাঁদের কবিতায় দেখা দিল। এই ধারণা মহাসমারোহে প্রতিষ্ঠিত হল যে, আধুনিক কবিতাকে হতে হবে নাগরিক ও কুটিল, তার মধ্যে পল্লী ও প্রসন্নতা থাকবে না, সে অবশ্যই মানুষের অন্তর্গত অন্ধকারকে উদযাপন করবে, শান্তিকল্যাণের ধারণাকে মাইলের পরে মাইলে উপহসিত হতে হবে। প্রেম নয়, পাপ ও কদর্যতার বিশ্লেষণ হয়ে উঠল কবিতার উপজীব্য। মূল সুর হল বিতৃষ্ণা। উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, বিপন্নতা, অনিশ্চয়তা হয়ে উঠল অপরিহার্য ‘গুণ’। কবি হলেন অনিকেত। তিনি যদি একজন নিরাশ্রয়, শিকড়হীন, ব্যর্থ নাগরিক মানুষ হন, হন নেশাখোর, এমনকি উন্মাদ, কামুক, অসামাজিক... তাহলে যেন তাঁর কবিস্বভাব সবচেয়ে মান্যতা পায়। এই মানসিকতা বাংলা কবিতায় ঢুকে এল বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে শার্ল বোদলেয়ারের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ নন, মাইকেল নন, তথাকথিত আধুনিক বাংলা কবিতার বিগ্রহ হয়ে উঠলেন শার্ল বোদলেয়ার, আর্তুর র‍্যাঁবো, এবং প্রথম পর্বের টি.এস. এলিয়ট। আধুনিক ব্যাপারটা আর একক ব্যক্তির থাকল না, তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া হল বেশ কিছু মান্য এবং মূলহীন শর্ত।
আর আজ তো তাঁর সাহিত্যজীবনের চেয়ে তাঁর যৌনজীবনের প্রতিই আমাদের বেস্টসেলার লিস্টের ঝোঁক বেশি দেখা যাচ্ছে। এটা রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়দের সময়, যখন সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিক পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘বৌদিবাজি’ নিয়েই মাতামাতি দেখছি।
এর মধ্যেই ২৫শে বৈশাখ। আবার একবার ‘বাক্’ আপনাদের সামনে।



অনুপম মুখোপাধ্যায়
(পরিচালক বাক্)





অনুপম বলছি



 RIP টোমাস ট্রান্সট্রোমার
                                                         

কাকে বলে বাংলা কবিতা? বাংলা কবিতা আবহমানকে রেফার করে না। বাংলা কবিতা যোগ রাখে খন্ডিত দেশকালের সঙ্গে। সারা পৃথিবী নয়, কথাপৃথিবীর বিশেষ দেশকালে তার বিহার। যদি অনুমতি করেন বলি, বাংলা কবিতা আদতে স্মৃতির কবিতা। স্মৃতি, আর সংস্কৃতি- বাংলা কবিতা স্বেচ্ছায় সীমাবদ্ধ হয়েছে। বাংলা কবিতা একটা সাংস্কৃতিক ব্যাপার, আপনি সংস্কৃতিকে রাখুন না রাখুন, সে আপনাকে রেখেছে, ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন, আপনি আমার চেয়ে বেশিই তা বোঝেন। কবি নন সাংস্কৃতিক কর্মী, দক্ষরাজ নন, শিবই তাঁর মালিক, কিন্তু কবিতা যদি কবির অনুভবে খাঁটি হয়, সে তার নিজের সংস্কৃতিতে গিয়ে ঠিক বসে যাবে, যেমন কচি পাতাটি শিলাস্তরে আঁকা থাকবে লক্ষ-কোটি বছর, নয়তো বিফল হবে প্রাকৃতিক নিয়মে ঠিক যেমন ফুলদানিতে রাখা প্লাস্টিকের ফুল।
            অবিশ্যি মানুষ যে নকল ফুল বানাতে পারে, সেই ফুল চোখকে ধোঁকা দিতে পারে, কে জানে হয়তো মৌমাছিকেও, এ কি কম কথা! কৃত্রিম ফুলও কি কম কথা গা! এটা লিখতে গিয়েই সত্যজিতের ‘চিড়িয়াখানা’ মনে পড়ে গেল।
            কিন্তু, বোদলেয়ারকে মনে পড়াই উচিত ছিল। আসলে শ্রেয়র বদলে প্রেয়র দিকে ঝোঁকটা চলেই যায়।
               আসুন প্রবেশ করা যাক ‘বাক্ ৮৮’-তে...




অনুপম মুখোপাধ্যায় 
(পরিচালক : ‘বাক্’)







'বাক্ ৮৭' প্রসঙ্গে


'বাক্ ৮৭' উৎসর্গ করা হল মুক্তচিন্তক ব্লগার অভিজিৎ রায়কে। ওঁর অনেক মতামতের সঙ্গে আমরা একমত না হতেই পারি, কিন্তু অভিজিতের মৃত্যু ওঁকে আমাদের মতামতের চেয়ে অনেক দূরে নিয়ে গেল। RIP অভিজিৎ রায়।








২০১৫ কলকাতা বইমেলার পরে ‘বাক্’-এর এটা প্রথম প্রকাশ।
২০১৫-র কলকাতা বইমেলা সম্ভবত একটা ব্যাপার স্পষ্ট করে দিয়ে গেল, এখনও বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে যারা বাংলা সাহিত্যের মেরুদন্ড, তারা আছে বলেই আমরা শ্বাস নিতে পারছি। আবার, এখনও বেশ কিছু পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে যারা সম্পাদক-প্রকাশকের আত্মশ্লাঘা ছাড়া আর কোনো কিছুকেই পোক্ত করছে না। একটা বইমেলা আজ এটাই স্পষ্ট করে দিতে পারে যে, আমরা বাঙালি সাহিত্যকর্মীরা আজও অন্ধদের দেশেই চশমার দোকান খুলে বসে আছি, মাঝেমধ্যে দু-একজন লোক আমাদের চশমা কিনতে আসছেন, যারা এমনিতে চোখে ভালই দেখতে পান, আমাদের চশমা ছাড়া তাঁদের দিব্য চলে যাবে।
আমাদের দোকান আমাদের আত্মার আয়না হোক প্রভু।
দেখতে পাচ্ছি, অনেক তরুণ কবি আবার ঝাঁক বাঁধছেন, যাতে অনেকে মিলে টিকে থাকা যায়। কবি আর পিরানহার ভেদ, কবি এবং কইমাছের ভেদ, তাঁরা স্বীকার করছেন না। এই ব্যাপার চিরকাল হয়েছে, এবং শেষ অবধি ব্যর্থ হয়েছে। 
অন্যদিকে, প্রাচীন কবি না পড়েই তরুণ কবিকে নস্যাৎ করে দিচ্ছেন, অথবা মাথায় তুলে নিচ্ছেন। কিছুক্ষেত্রে কিছু প্রাচীন কবি সেইসব তরুণকেই লালন-পালন করছেন যার ফোন তিনি প্রতিদিন পান, যার কবিতায় তিনি নিজের কবিতার বিস্তার দেখতে পান, যার কবিতা তাঁকে নিজের কবিতার অমরত্বের ব্যাপারে কোনোরকম ভয় দেখায় না, অপ্রাসঙ্গিকতার ছায়া ফেলে না।
ধরা যাক, একটি বিখ্যাত ও পুরোনো পত্রিকা ‘বিসারী’ (কাল্পনিক)। ‘বিসারী’-তে কবিতা প্রকাশিত হলেই একজন অনায়াসে কবি হয়ে যেতে পারেন। তাঁরা নিজেদের নামে একটি অনুরূপ বিখ্যাত পুরস্কার দেন। ‘বিসারী পুরস্কার’-এর প্রাপক কে হবেন সেটা কিন্তু নির্ধারণ করেন খ্যাতনামা অধ্যাপক কবি ও প্রাবন্ধিক অজিত হালদার (কাল্পনিক)। এ বছর সেই পুরস্কার পেলেন তরুণ কবি সাগর বসু (কাল্পনিক)। অজিত হালদারের বাড়িতে সাগরের নিত্য আসা-যাওয়া। অজিত সর্বত্র মুক্তকন্ঠে বলেন শূন্য দশকের শ্রেষ্ঠ কবির নাম সাগর। তাহলে এই পুরস্কারকে আমরা অনায়াসেই ‘অজিত হালদার পুরস্কার’ বলতে পারি, তাই না? এ ছাড়া অন্য কিছু হতে পারত কি?
অথচ, আমরা বাঙালি কবিরা কাকের মতো তাকিয়ে থাকি কিছু পুরস্কারের দিকে। ছোট কবি ছোট পুরস্কারের দিকে, মাঝারি কবি মাঝারির দিকে, প্রবল কবি বিরাট পুরস্কারের দিকে... একটা নগন্য কিছুও যদি পাই, এবং তার পিছনে থাকে যথেষ্ট কলকাঠির নড়নচড়ন, হয়ত একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হওয়ার আগেই ঠিক করা ছিল সেই বইটিকে পুরস্কার দেওয়া হবে, আমরা উদ্ভাসিত হয়ে সেই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করি, আবেগমথিত ভাষায় সেটা নেওয়ার সময়ে নিজের মনের ভাব ব্যক্ত করি, এবং ৩০০-৩৫০ লাইক পড়ে যায়।
সকলে নন। অবশ্যই বলছি, সকলে নন।
আজকাল শুরু হয়েছে শূন্য দশক এবং অন্যান্য দশক নিয়ে গদ্য লেখার চল। ধরা যাক, একজন গদ্য লিখলেন, এবং শূন্য দশকের ১০ জন কবির তাকিয়া, থুড়ি, তালিকা পেশ করলেন। সে তিনি করতেই পারেন। বাকস্বাধীনতা সবার আছে। কিন্তু, যিনি অন্য কবিদের মেধাতালিকা করার স্পর্ধা দেখাচ্ছেন, তিনি কি নিজে কবিতা লিখতে পারেন? এই গদ্যটা না লিখে তিনি নিজে কিছু কবিতা লেখার চেষ্টা করতে পারতেন কি? কবিতা যিনি লেখেন তিনিই কবিতা বোঝেন, এমন দাবি আমি করতে চাই না। কিন্তু, এই প্রশ্ন তো করতেই পারি, একটি পত্রিকা কোন মাপকাঠিতে তাঁকে একটি দশকের গতিপথ বিবেচনার ভার দিল? শূন্য দশকের কোন কবি কী কাজ করছেন, সেই বিচার করবেন ২০৩০-এর কবি বা পাঠক। তার আগে কেউ সেটা নিয়ে মাথা ঘামালে নিরপেক্ষতার এবং যোগ্যতার প্রশ্ন উঠে আসতে বাধ্য।
আর্কাইভ করা যেতে পারে, শূন্য দশকের কবিতার সংকলন হতে পারে, কিন্তু শূন্য দশকের কবিতার মূল্য নির্ধারণ করার অবকাশ আসতে আরো অন্তত ২০টা বছর অপেক্ষা করতে হবে, এই আমার ব্যক্তিগত মত। এ জন্য কারো বন্ধুতা, আশা করি, হারাতে হবে না আমাকে।

অনুপম মুখোপাধ্যায় 
(পরিচালক : ‘বাক্’)




‘বাক্-৮৬’ প্রসঙ্গে


‘বাক্ ৮৬’-র কবিতা বিভাগটি সম্পাদনা করেছেন কবি শ্রী ধীমান চক্রবর্তী। আশা করি এবারের কবিতা বিভাগ আপনাদের সামনে এক নতুন মাত্রায় নিজেকে হাজির করতে পেরেছে।

‘বাক্’-এর সম্পাদক আমি নই, পরিচালক মাত্র। কাজেই বিধিবদ্ধ সম্পাদকীয় লেখার দায়ও আমার নেই। আমার এই কলামকে ‘বাক্’-এর মত হিসেবেও মেনে নেওয়ার ব্যাপার নেই। ‘বাক্’-এর প্রতিটি সম্পাদক তাঁর নিজের পতাকাতলে স্বাধীন। এই কথাগুলো শুধু আমারই কথা। একটা গদ্য হিসেবেই পড়ুন আপনারা। 

না, আধুনিকের ধারণায় কালের কষ্টিপাথর একেবারেই অচল। স্থানও কিছু বলে না তার ব্যাপারে। সমাজও না। একজন ব্যক্তি আধুনিক হতে পারেন, অনেক ব্যক্তি আলাদা আলাদাভাবে আধুনিক হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু একটা সমষ্টি নয়। একটা আস্ত সমাজ আধুনিক হয়ে উঠতে পারে না। ‘আধুনিক’ শব্দটার আভিধানিক রূপে ‘অধুনা’ অবশ্যই বাস করে [অধুনা+ইক (ঠঞ্) ‘তত্র ভব’ অর্থে], এবং সে মনে করিয়ে দেয় ‘সাম্প্রতিক’-কে। একটি শব্দ শুধুমাত্র একটি মাত্রায় থাকে না, সে বহুমাত্রিক হতে বাধ্য। ‘আধুনিক কবিতা’ কখনই সাম্প্রতিক বা অর্বাচীন কবিতা নয়। ‘আধুনিক’ শব্দটা আমাদের অনেক সময়েই প্রতারণা করে। ঠিক যেভাবে ‘মৃগ’ আভিধানিকভাবে যে কোনো পশু হলেও আমাদের কাছে আজ শুধু হরিণ। যেমন আজ ইংরেজিতে ‘gay’ মানে আর ‘আনন্দময়’ নয়, সে বোঝায় পুরুষ সমকামীকে। ‘আধুনিক’ শব্দটার আভিধানিক অর্থ যাই হোক না কেন, সে আসলে একজন মানুষের জীবনশৈলীর নাম, সে আসলে একক ব্যক্তিজীবনের এক বিশেষ যাপনভঙ্গি, ব্যক্তির জীবন দর্শনের এক নিজস্ব ধাঁচ। সময়ের সঙ্গে তার সংযোগ আপেক্ষিক, তার আসল যোগ মানসিকতার সঙ্গে। রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পরে নতুন খৃস্টানরা নিজেদের জন্য একটি বিশেষণ বেছে নেন, একটি লাতিন শব্দ ‘মদার্নাস’। অখৃস্টানদের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য এই শব্দ। নিজেদের শুদ্ধতা ও মৌলিকতা বুঝিয়ে দিতেন তাঁরা এই শব্দটি দিয়ে। এই শব্দ থেকেই মডার্ন তথা আধুনিকের ধারণা। পৃথিবীর দুজন মানুষ কখনই একইরকম ভাবে আধুনিকের ধারণায় বাঁচতে পারেন না। প্রত্যেকের আধুনিক তাঁর নিজস্ব, ও একক।
এবং কবিতা শুধুমাত্র কবিতাই হয়। ব্রম্ভের মতোই তার আগে কোনো বিশেষণ লাগে না, অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায় যে কোনো আখ্যা। ‘আধুনিক’, ‘অধুনান্তিক’, ‘পুনরাধুনিক’, ‘সামাজিক’, ‘রাজনৈতিক’, ‘প্রেমের’, ‘প্রতিবাদের’ এমনকি ‘বাংলা/ইংরেজি/পারস্য/ফরাসি’ ... এগুলোর কোনোটাই কবিতার ক্ষেত্রে অপরিহার্য নয়, হাটে-ঘাটে-মাঠে আমরা নিজেদের সুবিধা অনুসারে এগুলোকে প্রয়োগ করি, নিজেদের সুবিধা অনুসারেই সরিয়ে নিয়ে আবার অন্য কোনো অভিধা খুঁজি। কবিতা লিখিত হয় কবির আত্মার অংশ হিসেবে, কিন্তু ছাপার পরে তাকে শরীর ধারণ করতেই হয়, এবং প্রতিনিয়ত ময়লা ও সাফ হতে হয় বিবিধ পাঠকের হাতে ও চোখে। ছাপা কবিতাটির আর সেই শুদ্ধ ও একক অবস্থান থাকে না। তার একটা নাম লাগে, ঠিকানা লাগে পিনকোড সহ, এমনকি তার অর্থমূল্যও থাকে।
ঠিক সেইভাবেই ‘পুনরাধুনিক কবিতা’। হয় না, এবং হয়। ‘পুনরাধুনিক’ শব্দটাকে আপনারা বিশেষণ হিসেবে না দেখলেই ভাল। সে একটা ধারণা। তাকে বিশেষ্য হিসেবেই দেখতে হবে। ইদানীং কবিতার নামের পরেই আমি একটি লেবেল অথবা ট্যাগ ব্যবহার করছি : ‘একটি পুনরাধুনিক কবিতা’। ঘটনা হল, খুবই অস্বস্তির সঙ্গে ওটা ব্যবহার করছি। এভাবে কোনো কবির তাঁর নিজের লেখাকে একটি বিশেষ ধারণায় সীমাবদ্ধ করা বেমানান। তবু এটা করছি, কারণ চাইছি পুনরাধুনিকের ধারণাটা লোকসমাজে প্রচলিত হোক। এবং, একমাত্র কবিতা ছাড়া তো আমার লোকের কাছে পৌঁছনোর পথ জানা নেই।
বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার একটা বড়ো অভিশাপ হল রবীন্দ্রনাথের কবিতার প্রতি বিদ্যায়তনের দৃঢ় অবস্থানের অভাব। বিংশ শতাব্দীর বাংলা কবিতার বিদ্যায়তনিক তথা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার মধ্যে যত ঢুকবেন, দেখতে পাবেন, তিনের দশকের কবিতাই হয়ে উঠতে চেয়েছে বাংলা কবিতায় আধুনিকের ভিত্তিভূমি। বিদ্যায়তন চেয়েছে তিনের দশকের কবিতাই আধুনিক কবিতার পরাকাষ্ঠা হয়ে উঠুক। সমস্যাটা হল, সে ওই দশকের আধুনিককে হাশিল করতে চেয়েছে রবীন্দ্রনাথের ‘অনাধুনিকতা’ দাবি করে। ছলে-বলে-কৌশলে বলা হয়েছে, প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হয়েছে, কালের কষ্টিপাথরে রবীন্দ্রনাথ ঠিক ‘আধুনিক’ নন। একজন জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, বা সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, এমনকি সমর সেনের কবিতায় আধুনিক যেভাবে ধরা দেয়, রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নাকি দেয় না। কবিগুরুর উপনিষদে অধিকার, তাঁর আশ্চর্য আভিজাত্য, ব্রাম্ভ উত্তরাধিকার, নাছোড় রোমান্টিকতা, সর্বোপরি তাঁর পরম আস্তিক্য নাকি আধুনিক কবি হিসেবে তাঁকে মান্যতা পেতে বাধা দেয়। অসংখ্য মূল্যবান প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে লেখা হয়েছে। অসংখ্য বই। কিন্তু, সভয়ে বলছি, তাঁর অন্যান্য দিকে পর্যাপ্ত আলোকপাত হলেও, একমাত্র আবু সায়ীদ আইয়ুব এবং শঙ্খ ঘোষ ছাড়া আর কেউ রবীন্দ্রনাথকে রবীন্দ্রনাথের নিজের আধুনিকের ধারণায় প্রতিষ্ঠিত করতে সচেষ্ট হননি গত ৫০ বছরে। বরং শিবনারায়ণ রায়ের মতো একজন বিদগ্ধ মানুষও তাঁর প্রবন্ধে গ্যেটের সঙ্গে তুলনা করে রবীন্দ্রনাথকে হেয় করেছেন, তাঁর সাহিত্যে রক্তমাংসমলমূত্রের অভাবই যেন রবীন্দ্রনাথকে প্রতিবন্ধী করেছে আধুনিকের দরবারে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কবিপুত্রটি যে কিছুতেই মানুষের বিছানা এবং টয়লেটটাকে দেখাতে চান না, কিছুতেই সত্য-শিব-সুন্দরে বিশ্বাস হারাতে চান না, এটাই যেন পর্যাপ্ত কারন তাঁর প্রতি ঘোর অবিশ্বাস রাখার।
সেটা স্বাভাবিক ছিল কি? হতে পারে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যজীবনের সোনাঝরা পর্বটা কাটিয়েছেন বিশ্বযুদ্ধের আগে। সেই পরিসরটা অন্য ছিল। সেই পরিসরের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিতে খারাপ লোকেরা ছিলেন, কিন্তু শয়তানরা ছিলেন না। নেপোলিয়নের স্মৃতি ছিল, কিন্তু হিটলারের অভিজ্ঞতা নয়। লর্ড ক্লাইভের কাহিনি ছিল, কিন্তু মুসোলিনির নয়। সেখানে প্রাকৃতিক মন্বন্তর ছিল, মানুষের হাতে তৈরি পরিকল্পিত দুর্ভিক্ষ ছিল না। সিপাহী বিদ্রোহ ছিল, কিন্তু কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প ছিল না যেখানে মানুষের হাড় দিয়ে বানানো হবে সিগারেট হোল্ডার। মানুষ যে প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, ঈশ্বর যে তাঁর নিজের অবয়ব দিয়েছেন মানুষকে, মানুষের উপরে কোনো সত্য থাকতে পারে না... দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ এসে সেই ধারণাকে চুরমার করে দিয়ে চলে গেল। একটা নীল গ্রহ যেন তার সবটুকু আস্থা নিয়ে তলিয়ে গেল। সেই গ্রহের বিরাট একটা অংশে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সর্বস্ব রেখেছিলেন। এর ফলেই রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বাস করা চুরমার দুনিয়ার পক্ষে মুশকিল হল, বিভিন্ন পশ্চিমী দেশে যুদ্ধকাতর পাঠকের মধ্যে রবীন্দ্রনাথের জনপ্রিয়তা কমে গেল, বইয়ের বিক্রি লক্ষ্যণীয়ভাবে হ্রাস পেল। আইনস্টাইন, চ্যাপলিন, আঁদ্রে জিদ, রমাঁ রলা, ব্রেশট, হারমান হেসের মতো চিরকেলে লোকেরা তাঁর সুনাম করলেও, এমনকি লোরকা, বুনুয়েলের মতো দুর্দমদের কাছে তাঁর সমাদর হলেও, রিলকে, থমাস মান, কাফকার মতো সাহিত্যিকের কাছে তাঁর ‘অচল’ আশাবাদের কোনো মর্য্যাদা হল না। আন্তর্জাতিক সময়টা কিন্তু রিলকে, মান আর কাফকারই অনুগত ছিল।
আমাদের এখানেও সময়ের ধারণা এসে দাঁড়াল রবীন্দ্রনাথ এবং তাঁর বিচারের মাঝখানে। তিনের দশকের কবিরা এসে পড়লেন সমসময়ের প্রতি তাঁদের আনুগত্য নিয়ে, আন্তর্জাতিক কবিতার গতি তাঁদের কবিতায় দেখা দিল। এই ধারণা মহাসমারোহে প্রতিষ্ঠিত হল যে, আধুনিক কবিতাকে হতে হবে কুটিল,  তার মধ্যে প্রসন্নতা থাকবে না, সে অবশ্যই মানুষের অন্তর্গত অন্ধকারকে উদযাপন করবে, শান্তিকল্যাণের ধারণাকে মাইলের পরে মাইলে উপহসিত হতে হবে। প্রেম নয়, পাপ ও কদর্যতার বিশ্লেষণ হয়ে উঠল কবিতার উপজীব্য। মূল সুর হল বিতৃষ্ণা। উদ্বেগ, উৎকন্ঠা, বিপন্নতা, অনিশ্চয়তা হয়ে উঠল অপরিহার্য ‘গুণ’। কবি হলেন অনিকেত। তিনি যদি একজন নিরাশ্রয়, শিকড়হীন, ব্যর্থ নাগরিক মানুষ হন, হন নেশাখোর, এমনকি উন্মাদ, কামুক, অসামাজিক... তাহলে যেন তাঁর কবিস্বভাব সবচেয়ে মান্যতা পায়। এই মানসিকতা বাংলা কবিতায় ঢুকে এল বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে শার্ল বোদলেয়ারের হাত ধরে। রবীন্দ্রনাথ নন, মাইকেল নন, তথাকথিত আধুনিক বাংলা কবিতার বিগ্রহ হয়ে উঠলেন শার্ল বোদলেয়ার, আর্তুর র‍্যাঁবো, এবং প্রথম পর্বের টি.এস. এলিয়ট। আধুনিক ব্যাপারটা আর একক ব্যক্তির থাকল না, তার উপরে চাপিয়ে দেওয়া হল বেশ কিছু মান্য শর্ত।
আধুনিক আর অবক্ষয় এক হয়ে দেখা দিল তার ফলে। কিছু কবির একটা বিশেষ ইমেজ তৈরি হল, জীবনে তাঁরা ব্যর্থ বলেই যেন কবিতায় তাঁরা দেবতা। কিছু কবির বোহেমিয়ানপনার প্রতি এই ধারণা ও আসক্তি আজও মরেনি। এখনও আমার সমবয়সী কবিকে দেখি নিজের গাঁজা, মদ নিয়ে গর্বিত, যারা নেশা করে না তাদের তিনি কবি মনে করেন না। একটু দাড়ি থাকবে, পোশাক-আশাক হবে অগোছালো ময়লা, হাতের নখ কাটা হবে না, একটা মলিন গিটার নিয়ে যে কোনো সিঁড়িতে বসে পড়লেন... অনেকেই ভাবছেন এই তো এক সত্যিকারের কবি! এই তো কেমন ইনি নিজের যাপন দিয়ে কবিতা লিখছেন! কেমন নিজের অচেতন খুঁড়ে সুররিয়াল আনছেন! যেমন অনেকে কবিতার পত্রিকার নাম রেখেছেন ‘উন্মার্গ’, ‘রসাতল’, ‘দুর্বিপাক’, ‘পাগলাগারদ’... ইত্যাদি। এতে আধুনিক অনেক দূরে সরে গেছে। এইসব নামকরণ পোস্টমডার্ন মানসিকতাকেই দর্শায়, আধুনিককে ধর্ষায়। রবীন্দ্রযুগের পত্রিকাগুলোর নামকরণের ( ‘ভারতী’, ‘সাধনা’, ‘সবুজপত্র’, ‘ভারতবর্ষ’ ... এমনকি ‘কল্লোল’) পাশাপাশি এই নামগুলোকে বসালেই পরিসরের বদলটা চোখে পড়বে, এবং চেতনার বাঁকবদলটাও। আজও চরম ঋণাত্মক নামকরণ নিয়ে পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। পত্রিকার নামকরণ থেকে কিন্তু অনেকটাই বোঝা যায় তার শ্বাসপ্রশ্বাস কীরকম। সম্পাদক যদি তাঁর পত্রিকার নাম রাখলেন ‘সায়ানাইড’, পাঠক সেখানে অমৃত না-ও পেতে পারেন।
যাই হোক, জীবদ্দশায় অবহেলিত হলেও তাঁর মৃত্যুর পরেই রবীন্দ্রনাথের প্রতিস্পর্ধী হিসেবে খাড়া করা হল জীবনানন্দ দাশকে। অনেকের কাছে রবীন্দ্রনাথ তখন বাতিল এক কবি, আর জীবনানন্দই হলেন উপাস্য ও অনুসরণীয়। অথচ, প্রথম জনের তুলনায় দ্বিতীয়জন এক কিংবদন্তি ছাড়া কিছুই নন। যদি তাঁর লোভনীয় মিশ্রকলাবৃত্ত তুলে নেওয়া হয়, ব্যাবিলন-মিশরের হাতছানি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া হয়, জীবনানন্দর অসংখ্য কবিতা তাঁর সমকালীন বিপন্ন পৃথিবীর ধারাবিবরণী ছাড়া আর কিছুই থাকে না। ভাবের নিরিখে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একমাত্র ‘দুঃসময়’ কবিতাটিই যথেষ্ট হবে জীবনানন্দর ওই কবিতাগুলির এবং তথাকথিত কালচেতনার ভার সামলাতে। অবশ্য জীবনানন্দর চেয়ে স্টাইল-সচেতন কোনো কবি সম্ভবত আসেননি বাংলা কবিতায়। আন্তর্জাতিক কবিতার প্রতি জীবনানন্দর সচেতনতা অগাধ। জীবনানন্দ আন্তর্জাতিক কবিতার নিবিষ্টতম পাঠক ছিলেন। কতখানি গভীরে গিয়ে তিনি বোঝাপড়া করতে চেয়েছিলেন বাংলা কবিতার সঙ্গে, সেটা তাঁর গদ্যগ্রন্থ ‘কবিতার কথা’ পড়লেই বোঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের আধুনিক সম্পর্কে জীবনানন্দের নিঃসংশয় উক্তি ওই গ্রন্থে আছে। জীবনানন্দ দাশ নিজের একটা পৃথিবী চেয়েছিলেন বাংলা ভাষায়, যেটা রবীন্দ্রনাথের ভুবন থেকে প্রশ্নাতীতভাবে আলাদা। তিনের দশকে একমাত্র জীবনানন্দ দাশই সেটা পেরেছিলেন, বাকি সকলের লেখাতেই রবীন্দ্রনাথের উপস্থিতি না হোক মুখর অনুপস্থিতি অনুভব করাই যায়।
নিঃসংশয়েই এই কথা বলা যায় যে, জীবনানন্দ দাশ লিখিত ‘আট বছর আগের একদিন’ হল বাংলার প্রথম পোস্টমডার্ন কবিতা, জীবনানন্দ দাশ প্রণীত ‘সাতটি তারার তিমির’ তার নামকরণ (নামটাই যা বলার বলে দেয়) থেকে শুরু করে প্রতিটি কবিতার প্রতিটি শব্দে বাংলার প্রথম পোস্টমডার্ন কাব্যগ্রন্থ। উত্তর-উপনিবেশ এবং পোস্টমডার্নকে আমাদের এখানে আলাদা করার উপায় নেই। বিশ্বযুদ্ধের আঘাত, এবং স্বাধীনতার অব্যবহিত পূর্ব এবং পর অবধি যে দেশব্যাপী রক্তপাত, খোদ ভারতবর্ষ নামক ধারণাটিরই একাধিক দেশে খণ-খন্ড হয়ে যাওয়া, বন্যার মতো ঢুকে আসা উদ্বাস্তুর দল আমাদের চেতনা থেকে আধুনিকের সবটুকু আলো শুষে নিয়েছিল। চিরকালীন আদর্শের, সনাতন জীবনদর্শনের সাময়িক গ্রস্ত হওয়া ছাড়া কোনো উপায় ছিল না। তিনের দশক থেকেই শুরু হয়ে গিয়েছিল বাংলা কবিতার পোস্টমডার্ন পর্ব। দেশভাগের পরে তার সঙ্গে যুক্ত হল উত্তর-উপনিবেশের খোয়ারি। সত্যিই রবীন্দ্রনাথ এই পরিসরে অনেক দূরের এক নক্ষত্র, তাঁকে সম্ভ্রমের সঙ্গে অবলোকন করা চলত, কিন্তু তাঁকে স্পর্শ করার আঙ্গুলগুলোয় তখন কুষ্ঠরোগের লক্ষণ। বরং শার্ল বোদলেয়ার এই পরিসরে একজন জাগ্রত দেবতা। র‍্যাঁবো একজন দেবদূত। জীবনানন্দ দাশ এই পরিসরের ভাষ্যকার। বাংলার প্রথম পোস্টমডার্ন কবি। একজন প্রতিনায়কের মোহময়তা তাঁকে ঘিরে নিয়েছে। তাঁর প্রভাব বিস্তৃত হল পঞ্চাশের দশকে। আলোক সরকার, শঙ্খ ঘোষের মতো কবিরা থাকলেন নিজস্ব লাইট হাউসে। ‘শতভিষা’ পত্রিকা আধুনিকেরই সাধনা জারি রেখেছিল, কিন্তু রাবীন্দ্রিকতা অনুসরণ না করলেও তাকে অতিক্রম করতেও পারেনি। আর স্বীকারোক্তিমূলক কবিতার মহারথীরা বোদলেয়ারীয় তথা জীবনানন্দীয় রক্তকণিকাগুলোতে আরো দিলেন অক্সিজেন। সেটা গড়াল ছয়ের দশক অবধি। ছয়ের দশকের সাহিত্য আন্দোলনগুলো... যেমন ‘হাংরি’ বা ‘ধ্বংসকালীন’ ... আদৌ আধুনিক ছিল না। ওগুলো পোস্টমডার্ন আন্দোলন ছিল।
বাংলা সমাজে পোস্টমডার্ন তার প্রভাবের শীর্ষবিন্দুতে পৌঁছেছিল সাতের উত্তাল দশকে। কিন্তু এই দশক থেকেই বাংলা কবিতায় জীবনানন্দীয় আবহাওয়ায় ফাটল ধরতে শুরু করে। এই দশকের যারা সমর্থ কবি, তাঁদের মধ্যে উত্তর-উপনিবেশের ছায়া প্রত্যক্ষ নয়, কারণ তাঁরা ব্রিটিশ উপনিবেশের স্মৃতি করোটিতে নিয়ে, বা দেশভাগের রক্ত কপালে নিয়ে কবিতা লিখতে আসেননি। পোস্টমডার্নের ব্যাপারটা তখন একটা আবহাওয়া, অনস্বীকার্য। কিন্তু  জীবনানন্দর সংক্রমণ বেশ ক্ষীণ। আশির দশকে তা আরো স্তিমিত হয়। নব্বইয়ে আরো। আজ জীবনানন্দ দাশের প্রভাবে কোনো শূন্য দশকের বা প্রথম দশকের সচেতন কবি কবিতা লিখবেন, এটা প্রায় অবাস্তব। আজ তাঁর কবিতার চেয়ে জীবনানন্দর উপন্যাসের মূল্য বরং অনেক বেশি। বাংলা কবিতার একটা যুগান্তরের কারণ হওয়ার পাশাপাশি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম ঔপন্যাসিক জীবনানন্দ দাশ, কিন্তু এ এক প্যারাডক্স যে, আমাদের দেশে তাঁর উপন্যাস পাওয়া যায় না সহজে, অনেক ক্লেশে সংগ্রহ করতে হয়।
মজার ব্যাপারটা হল, আমাদের এখানে পোস্টমডার্নের ধারণাটা প্রবেশ করল তখন যখন সে বাস্তবে স্যাচুরেটেড হয়ে গেছে। নব্বইয়ের দশকের শেষে আমাদের ‘তাত্ত্বিক’-রা তাকে শনাক্ত করলেন। জীবনানন্দের মৃত্যুর অর্ধেক শতাব্দী পরে। সেটাও আবার করলেন এমন ভঙ্গিতে যেন সেটা একেবারে নতুন ব্যাপার, যেন সেটা পরিস্থিতি নয়, ভবিষ্যতের বাংলা কবিতার পথ। যে বৈশিষ্ট্যগুলোকে তাঁরা পোস্টমডার্ন কবিতার লক্ষণ হিসেবে তুলে ধরলেন, একটু মনোযোগ দিলেই এবং তুলনামূলক পাঠের অল্প শ্রম স্বীকার করলেই বোঝা যাবে সেগুলো আসলে তিনের দশক থেকে শুরু হওয়া বোদলেয়ারীয়-জীবনানন্দীয় বাংলা কবিতার গ্রাফিক বর্ণনা। সেই কবিতাকেই আধুনিক কবিতা হিসেবে প্রচারিত করা হয়েছে জনমানসে এবং বিদ্যায়তনে। ক্লান্তি, নৈরাশ্যবোধ, আত্মবিরোধ, শিকড়হীনতা, যান্ত্রিকতা, অবচেতন মনের খনন, আর্তনাদ, প্রলাপ, প্রেম-সুন্দর-কল্যাণ-ধর্মের মতো সনাতন মূল্যবোধগুলোয় অনাস্থা, চিন্তার কুষ্ঠরোগ, অসম্বদ্ধতা, উদ্বেগ, দৈহিক ক্ষুধার মান্যতা... এগুলোকে আধুনিক কবিতার নির্ণায়ক হিসেবে উপস্থিত করা হল। কিন্তু তা কী করে হয়? আলোর পিপাসা ছাড়া, জগতের সঙ্গে আত্মীয়তার বোধ ছাড়া, আত্মার শুভ উদ্বোধন ছাড়া, বিবেকের সায়, মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা ছাড়া, নিজস্ব চিন্তাভাবনার অতল গভীরতা ছাড়া একজন কবি কী করে আধুনিক হতে পারেন? বিশেষ করে আমাদের দেশে, যে দেশ উপনিষদের, গীতার, মীরার ভজনের, মঙ্গলকাব্যের, পদাবলীর, রামপ্রসাদের, গালিবের, লালনের, কথামৃতর, রবীন্দ্রনাথের, বিবেকানন্দের? সাধারণ পাঠক যে বাংলা কবিতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তার একটা কারণ আধুনিকের এই অপব্যাখ্যা। আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য বোদলেয়ারের বিতৃষ্ণা অন্য গ্রহের জিনিস। এটাও অবশ্যই উল্লেখ করতে হয় সব কবিকে এই আবহাওয়া স্পর্শ করেনি, করলেও তাঁরা গ্রস্ত হননি। তাঁরা জনমানসে সেই অর্থে প্রবল হননি, হতে চাননি। নিজের-নিজের আলোয় ঘেরা একেকটি দ্বীপ হয়ে আছেন। বোঝা গেছে আধুনিকের মৃত্যু নেই। বিবর্তন আছে।
হ্যাঁ, তিনের দশকের পর থেকে প্রবাহিত এই অধুনান্তিক হাওয়াকে শনাক্ত করা গেছে বিংশ শতাব্দীর শেষে, কিন্তু শনাক্ত করা হয়েছে বিদেশী তত্ত্ববিশ্বের সাহায্যে। এই আবহাওয়াই সাধারণ শিক্ষিত মানুষ এবং কবিতার মধ্যে পাঁচিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে মারাত্মক যে ব্যাপারটা হয়েছে, বিরাট কবি এবং মহৎ কবিতার ধারণাটা এখানে এখন লুপ্ত হতে বসেছে। বিশেষ করে ২০১০ পরবর্তী কবিতায় এই মানসিকতা প্রকট হয়ে উঠছে। কবিতা লেখার কাজটা আজ অনেক তরুণ/তরুণীর কাছে ইউজ অ্যান্ড থ্রো-র পর্যায়ে চলে গেছে। পত্রিকাগুলো ছেয়ে যাচ্ছে কবিতার প্রোডাকশনে। কবিতা লেখার চেয়ে সোজা কাজ বুঝি আজ পৃথিবীতে নেই, বিশেষ করে তা যদি হয় ‘ভাল কবিতা’। নিজের কবিতায়, নিজের কবিতার কোনো আবিষ্কারে কবির মালিকানা আজ হাস্যকর হয়ে যাচ্ছে, যে কেউ তাঁর কবিতায় অন্যের কবিতার গুণ আরোপ করতে পারছেন, এবং তাতে সাবাশির কোনো অভাব হচ্ছে না। হাইব্রিড কবিতার শেষ নেই, একবার ছাপা হয়ে যাওয়ার পরে কবির কাছেই মূল্যহীন হয়ে যাওয়া কবিতাগুলোর স্তুপ আকাশ ছুঁতে চাইছে। এই পরিসরের স্বপ্নই তো দেখেছিলেন বিংশ শতাব্দীর শেষে এসে পড়া পোস্টমডার্নের  চিন্তকরা, তাঁরা তো এটাই চেয়েছিলেন যে, কোনো প্রবল কবিকে তাঁর প্রবলতা ধরে রাখতে দেওয়া হবে না, ক্ল্যাসিক বলে কিছু থাকবে না, মৌলিকতার প্রশ্নটাকে তুড়ি দিয়ে অচল করা হবে, বরং অগণিত অন্যমনস্ক যশোলোভী কবিতে ছেয়ে যাবে লেখার ভুবন, প্রমাণিত হবে ছাপার উপযুক্ত কবিতা লেখাটা আসলে অনেক খেলো ব্যাপার, যে কেউ পারে। সেটাই হচ্ছে। পত্রিকার চেয়ে পত্রিকার সূচীপত্র নিয়ে আজকের কিছু কবি বেশি ভাবছেন। তাঁরা আবহাওয়ার সস্তা শিকার। আধুনিক শব্দটা আজ তাঁদের কাছে অলীক।
তাই পুনরাধুনিক। না, মোটেই আবার ফিরে যাওয়া নয় তিনের দশকের আগের পরিসরে, রবি ঠাকুরের কালে। সেটা অবাস্তব। পুনরাধুনিক টাইম ট্রাভেল নয়। সে মোটেই নয় re-modern, সে বরং neo-modern । পুনরাধুনিক হল আধুনিককে নতুন করে আবিষ্কার। সামাজিকভাবে সেটা সম্ভব নয়, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে অবশ্যই সম্ভব।  পুনরাধুনিক একটা ভাবনা, একটা জীবনশৈলী, আদৌ কোনো তত্ত্ব নয়, কোনো গাণিতিক বিশ্লেষণ নয়, সাহিত্য আন্দোলন নয়। কে একজন পুনরাধুনিক কবি? তিনিই যিনি একমাত্র নিজের কবিতার উৎকর্ষের প্রতি দায়বদ্ধ। কোনো ধান্দা ও ফাটকার লাইনে তাঁকে দেখা যাবে না। তিনি নিজের এক অবস্থান বেছে নিয়েছেন। একজন গবেষকের ল্যাবরেটরি বা একজন শিল্পীর নির্জন স্টুডিওর মতো তাঁর লেখার ঘর, বা টেবিল, বা তক্তাপোষ... এক সাধনাকক্ষ। তাঁর কোনো গোষ্ঠী নেই। গুরুদেব নেই। তিনি একলব্য। সাংস্কৃতিক রাজনীতি থেকে তিনি দূরে থাকেন। কবিতা উৎসবে তিরিশ সেকেন্ড কবিতা পাঠের জন্য লালায়িত হয়ে তিনি একশ কিমি যাত্রা করবেন না। দামি পত্রিকায় লেখার জন্য নিজের জিভ বন্ধক দেবেন না। প্রতিষ্ঠানের চৌকাঠে হত্যা দেবেন না। ‘কোথায় লিখছেন’, এটা তাঁর প্রশ্ন নয়, ‘কী লিখছেন’, সেটাই প্রশ্ন। নৈতিকতার ধারণা তাঁর কাছে হাস্যকর নয়। সমাজের মধ্যে তিনি অন্ধ নন, তাঁর মধ্যেই আছে একটা আস্ত সমাজ-পরিস্থিতি, তাই ঘটনাবলীর ধারাভাষ্য দেওয়াটা তাঁর কাজ নয়। সমাজ-রাজনীতি তাঁর কন্ঠ শুনতে পাবে, তাঁকে শারীরিকভাবে পাবে না। তিনি ভঙ্গিসর্বস্ব নন, আবার শুধু বক্তব্যনির্ভরও নন। তাঁর বলার আছে ঢের, বলার অনুচ্ছিষ্ট পথটাও তিনি খুঁজেছেন, খুঁজছেন, পাচ্ছেন। নিজের কবিতার জন্য তিনি নিরাপত্তা নয়, সর্বস্ব পন রেখে একটা দুর্দান্ত ও বিপজ্জনক রণ বেছে নিয়েছেন। তিনি নতুন শতাব্দীর শিকড়সন্ধানী কবি। শতাব্দী একটা কালখন্ড নয়, একটা বাসভূমি, সে ব্যক্তি ও সমষ্টি উভয়েরই।
আর পুনরাধুনিক কবিতা? সে হল সেই কবিতা যার মধ্যে আবহমান কবিতার জেনেটিক সংকেত ও সার্বিক উত্তরাধিকার আছে, কিন্তু স্থাবর বা অস্থাবর কোনোরকম সম্পত্তিরই দাবি নেই। পুনরাধুনিক কবিতার জন্য কোনো নির্ধারিত তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য থাকবে না। কারণ, প্রত্যেক পুনরাধুনিক কবি তাঁর কবিতাকে তাঁর নিজেরই পৃথিবীতে খুঁজে নেবেন। সেই পৃথিবীটাকে শুধু হতেই হবে... প্রথম পৃথিবী। এই কবিতার কিছু জীবনধর্ম অবশ্যই আছে, কারণ কবিতার কোনো নির্ধারিত সংজ্ঞায় সে আটকে থাকবে না, থাকলে সে বাঁচবে না এই নতুন পরিসরে। সেগুলোর আলোচনা অন্য অবসরে।


অনুপম মুখোপাধ্যায় 
(পরিচালক : ‘বাক্’)



'বাক্ ৮৫' প্রসঙ্গে


আয় না, আয় না...

এই আয়না আয়না খেলায় আমি তো কেবল আমি খুলে খুলে আমরা’র রঙ্গিলাপুরে ডাক রোদ পেতেছি, ছায়াকে অক্ষর ভেবেছেন কেউ, কেউ বা আত্মপুর... এই তো সময় মুর্শিদ... এ ওর ডাকে, সে তার আয়নায় ঢুকে গিয়ে বিনিময়ের তাবিজ ওড়াবে... আর রেখে যাবে এক-একটা মায়া-পুর মহাকাশ জুড়ে আর পঞ্চভূতে... এ যেন আয়নামহল...

আর এই আত্ম-অপর খেলাটাই তবে বিপননবাদী সময়ে একটা কালেকটিভ স্পেস হয়ে উঠুক... সাইবারকলোনির হাইপারকোডগুলি যখন ভাষা-প্যানোরামার হরফ-বৈচিত্র্যকে ঝাঁঝিয়ে তুলছে ফ্ল্যুরোসেন্ট রঙে, তখন কুলকুণ্ডলিনী থেকে ফের বের করি চিরায়ত আয়না... নির্বাক হয়ে যাওয়া পরিকাঠামোয় আমরা ফের ফিসফিস থেকে কলরব, কলরব থেকে জিকির-সংকীর্তন শুরু করি, আর ভাষায় লাগুক মাটি...

আসলে, অ্যাড কিংবা অ্যাডিকশনের জড়ানো কথনে ফুঁ দিয়ে আমরা যদি মোহ খুঁড়ে আয়না জাগাতে পারি... যা বলছি থেকে যা বলতে চেয়েছি, যা বলতে চেয়েছির আড়ালে যে বাক্‌ সাঁই হয়ে গেছে... তার প্রেম, তার প্রকৃতি, তার ক্ষুধা, তার রাতভোর, তার মরুযাপন, তার বিদ্রোহ, তার রক্তস্রাববীর্যস্নান... তাকেই স্বাগত জানাতে চেয়েছি, ডেকেছি আয় না, আয় না... সেই ডাকে এ বাঁক সে বাঁক থেকে অনেক তরী স্ববাক এসেছে ‘বাক্‌’-এ... আমি তাকে কবিতা বলে চিনি, আমি তাকে জন্মাজন্ম, আমি তাকে কাবাঘর, আমি তাকে প্যারিস-৬৮, আমি তাকে তেভাগায় চাঁদ ... আমি তাকে না-কথা সমুদ্রের পাড়ে ফেলে রাখা চটি, নামে গান ধরি।

সে মতই এই সংখ্যার আকুতি, সে মতই ডেকেও অনেক না পাওয়া, সে মতই আবার আসিবো ফিরে... সে মতই প্রকরণে ডানাওয়ালা ঘড়ি... কূল নাই সীমা নাই... ভাসুন, আবারো আসুন এই স্বাগত সময়ে গুন টানতে শস্যের খোঁজে... আমেন!!!

অতনু সিংহ
(কবিতা সম্পাদক : বাক্ ৮৫)
২৬.১১.২০১৪



অনুপম বলছি। এসে পড়ল ‘বাক্ ৮৫’। আপনাদের স্বাগত জানাই।

এই ২০১৪-র শেষে একটা ওয়েব পত্রিকা সম্পাদকের পছন্দের তালিকা ও জনসংযোগ দেখাতে আসে না। সম্পাদকের ব্যক্তিগত রুচি এবং সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একটা ওয়েব পত্রিকা চলে না। সেটা মৌলবাদ ডেকে আনে। একটা পত্রিকা চলে ... স্ট্র্যাটেজিতে। বাঁচার স্ট্র্যাটেজি... এবং সেই কৈফিয়ত, যা ডারউইন সাহেব দিয়েছিলেন। স্ট্র্যাটেজি কাকে বলে? সেই পরিকল্পনাকে বলে যা একটি ফুটবল টিমের থাকতেই হয়, নাহলে তার মাঠে নামার যুক্তি থাকে না। সেই পরিকল্পনাকে বলে যা একটি কৃষিক্ষেত্রে বীজ বপনের আগেই কৃষককে করে ফেলতে হয়।

একটি ওয়েব পত্রিকা আজ আর শুধু লেখা প্রকাশ করার জায়গা হতে পারে না। কবিদের প্লাটফর্ম হওয়ার দায়ও গেছে ফুরিয়ে, সেই দায়ভার নেওয়ার জন্য অনেক ওয়েব পত্রিকা আজ প্রস্তুত ও উন্মুখ। এখন একটি ওয়েবপত্রিকা প্রকাশিত হলে, তার যোগ্যতা, লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্নটা উঠতেই পারে।

 কেন এই পত্রিকা? কী তার প্রয়োজন?

৫ বছর পেরিয়ে এসে বাংলা কবিতার প্রথম ব্লগজিন 'বাক' চাইছে আজও তাকে ওই প্রশ্নটা করা হোক। কেন 'বাক'? কেন সে আজও চলমান? কেন তাকে আরো বাঁচতে হবে? আরো তো অনেক পত্রিকা এসে পড়েছে!

হ্যাঁ, তার লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য... এই শব্দগুলোকে আরো পরিস্ফূট করার তাগিদ থেকেই ‘বাক্’ আবার এল।  

অনুপম মুখোপাধ্যায়
(পরিচালক : ‘বাক্’ )