• কবিতা সুর্মা


    কবি কবিতা আর কবিতার কাজল-লতা জুড়ে যে আলো-অন্ধকার তার নিজস্ব পুনর্লিখন।


    সম্পাদনায় - উমাপদ কর
  • ভাবনালেখা লেখাভাবনা


    কবিতা নিয়ে গদ্য। কবিতা এবং গদ্যের ভেদরেখাকে প্রশ্ন করতেই এই বিভাগটির অবতারণা। পাঠক এবং কবির ভেদরেখাকেও।


    সম্পাদনায় - অনিমিখ পাত্র
  • সাক্ষাৎকার


    এই বিভাগে পাবেন এক বা একাধিক কবির সাক্ষাৎকার। নিয়েছেন আরেক কবি, বা কবিতার মগ্ন পাঠক। বাঁধাগতের বাইরে কিছু কথাবার্তা, যা চিন্তাভাবনার দিগন্তকে ফুটো করে দিতে চায়।


    সম্পাদনায়ঃ মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়
  • গল্পনা


    গল্প নয়। গল্পের সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করতে চায় এই বিভাগ। প্রতিটি সংখ্যায় আপনারা পাবেন এমন এক পাঠবস্তু, যা প্রচলিতকে থামিয়ে দেয়, এবং নতুনের পথ দেখিয়ে দেয়।


    সম্পাদনায়ঃ অর্ক চট্টোপাধ্যায়
  • হারানো কবিতাগুলো - রমিতের জানালায়


    আমাদের পাঠকরা এই বিভাগটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারবার। এক নিবিষ্ট খনকের মতো রমিত দে, বাংলা কবিতার বিস্মৃত ও অবহেলিত মণিমুক্তোগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে আনছেন, ও আমাদের গর্বিত করছেন।


    সম্পাদনায় - রমিত দে
  • কবিতা ভাষান


    ভাষা। সে কি কবিতার অন্তরায়, নাকি সহায়? ভাষান্তর। সে কি হয় কবিতার? কবিতা কি ভেসে যায় এক ভাষা থেকে আরেকে? জানতে হলে এই বিভাগটিতে আসতেই হবে আপনাকে।


    সম্পাদনায় - শৌভিক দে সরকার
  • অন্য ভাষার কবিতা


    আমরা বিশ্বাস করি, একটি ভাষার কবিতা সমৃদ্ধ হয় আরেক ভাষার কবিতায়। আমরা বিশ্বাস করি সৎ ও পরিশ্রমী অনুবাদ পারে আমাদের হীনমন্যতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরটি সম্পর্কে সজাগ করে দিতে।


    সম্পাদনায় - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
  • এ মাসের কবি


    মাসের ব্যাপারটা অজুহাত মাত্র। তারিখ কোনো বিষয়ই নয় এই বিভাগে। আসলে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কবিকে নিজেদের মনোভাব জানাতে চাই। একটা সংখ্যায় আমরা একজনকে একটু সিংহাসনে বসাতে চাই। আশা করি, কেউ কিছু মনে করবেন না।


    সম্পাদনায় - নীলাব্জ চক্রবর্তী
  • পাঠম্যানিয়ার পেরিস্কোপ


    সমালোচনা সাহিত্য এখন স্তুতি আর নিন্দার আখড়ায় পর্যবসিত। গোষ্ঠীবদ্ধতার চরমতম রূপ সেখানে চোখে পড়ে। গ্রন্থসমালোচনার এই বিভাগটিতে আমরা একটু সততার আশ্বাস পেতে চাই, পেতে চাই খোলা হাওয়ার আমেজ।


    সম্পাদনায় - সব্যসাচী হাজরা
  • দৃশ্যত


    ছবি আর কবিতার ভেদ কি মুছে ফেলতে চান, পাঠক? কিন্তু কেন? ওরা তো আলাদা হয়েই বেশ আছে। কবি কিছু নিচ্ছেন ক্যানভাস থেকে, শিল্পী কিছু নিচ্ছেন অক্ষরমালা থেকে। চক্ষুকর্ণের এই বিনিময়, আহা, শাশ্বত হোক।


    সম্পাদনায় - অমিত বিশ্বাস

স্বপন রায়

জানিনা তো!


একটু এগোলেই আচমকা ঢালু  হয়ে নেমে যাওয়া কালভারট আসবে,আমরা সাইকেলের প্যাডেলকে স্বাধীনতা দিয়ে জঙ্গল আঁকড়ানো সেই পথের নেমে যাওয়ায় ক্রমশ লুজ হতে থাকি,ক্রমশ রম্য হতে থাকি!ওই সময়ে আমাদের কোন সহায়ক ছিল না যে বলবে,এই রাস্তার শেষে একটা নদি আছে,তার রং সবুজ,তার জলে কুমীর,তার ডাঙায় অবিমিশ্র শাল,সেগুনের চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশাটাইপের মৌরসিপাট্টা!তো,এই না-বলা,না-জানা পথের আশিক আমরা চারজন,ক্লাস নাইন,ইস্পাত বিদ্যালয়,সেক্টর-১৮,রাউরকেলার প্রতিনিধি!আমাদের পাশ দিয়ে চলেছে বারসূয়াঁ যাওয়ার মিটারগেজ রেললাইন!প্রায় দু ঘণ্টা ধরে পাহাড়ি রাস্তার উঁচুনিচু পেরোচ্ছি আমরা,জঙ্গল আর পাহাড়ের মাঝখানে শুয়ে থাকা এই রাস্তার নাম কি জানিনা,এত একা একটা রাস্তায় বিচ্ছিন্ন কিছু আদিবাসী মেয়ে ছাড়া কোন চলাচল নেই,মেয়েগুলো আমাদেরই বয়েসি,মাথায় নেওয়া লাকড়িমানে জ্বালানিকাঠের  বোঝা নিয়ে কে জানে কোথায় যাচ্ছে!

ক্লাস নাইন তখন,আর গল্প লিখি!থ্রিলার!!কবিতা আসতো ঘুমের আগে,সেই ক্লাস সিক্স থেকেই,প্রণাম নেতাজী প্রণাম/তোমাকে জীবন দিলাম বা পিউবারটির ইয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে লিলি/কিছু বলবো তোকে/বলি? তো স্বপ্নে যেমন দোষ থাকে,গুণও থাকে!কিন্তু সে সব কবিতা করে খাতায় নামানোর চেয়ে হিমালয়ের কোন অচেনা শহরে কোন একজন লম্বা একহারা মানুষের ডায়েরি হারিয়ে যাওয়া,সে ডায়েরির ভেতরে থাকা রহস্যময় লিপি আমায় তখন ব্যস্ত রাখতো,ইনফ্যাক্ট আমি ওই ডায়েরির রহস্য নিয়ে ভাবতে ভাবতেই সাইকেল চালাচ্ছিলাম!আস্তে আস্তে একটা স্টেশন ফুটে উঠলো,চম্পাঝারণ....স্টেশন না রিয়ার মুচকি হাসি?রিয়া,রিয়া এলো কোত্থেকে?

রিয়া হাসে,বলে,তুই এত সব কি পড়িস?
কি ভাবে বলি,আমি একনম্বরের ফাঁকিবাজ,ওসব বই শুধু তোকে ইম্প্রেস করার জন্য!
বইগুলো আমার হাতে ব্যারিটোন ভয়েস হয়ে বলে ওঠে,লে পাঁচু এবার বইগুলোর নাম বল!দাস ক্যাপিটাল,ওয়ার এন্ড পিস,আ কানেকটিকাট ইয়াঙ্কি ইন কিং আরথারস কোর্ট,টম ব্রাউনস স্কুল ডেজ,হাউন্ড অফ দ্য বাস্কারভিলস,লেফট উইং কমিউনিজম অ্যান ইনফেন্টাইল ডিসঅর্ডার...কি হল,বলে ফেল,জিভে আটকাচ্ছে?আমি ইতি গজর স্বরে কোনরকমে বলি,ওই আর কি,ইয়ে তুই পড়বি?

কিশোরাঙ্গি হাসিতে সেই প্রথম দেখলাম মিশে গেল বিয়ার লেগুনে কায়াক-চলা দুষ্টুমি!
বললো,নারে তুই মন দিয়ে পড়,পড়ে আমায় বুঝিয়ে দিস!

এ সব অনেক পরে এসেছে আমার লেখায়,কিন্তু ওই দেখাটা চেতনাসিক্ত হয়ে রয়ে গিয়েছিল,পরে এইসব স্মৃতিল উদ্ধার কবিতার কাছে নিয়ে গেছে আমায়,তবে সে সব পরে,অনেক পরে!তখন ক্লাস নাইন,স্কুলের লম্বা বারান্দা ‘’সাম্পান হয়নি তখনো!আলাস্কার বিয়ার লেগুন বা কায়াকের ভেসে যাওয়া তখন কোথায়?শুধু যে বিরলকিশোরী চোখদুটো আর অসুখহীনা হাসি এ সবের আরম্ভে ছিল আমি তার কাছে অসহায় ছিলাম, প্রায় বোকাচৌকোই ছিলাম!চৌকো শব্দটা ব্যবহার করতাম এই ভেবে যে বড়রা চৌকোর আসল রহস্য ধরতে পারবে না,এখন বুঝতে পারি কি গান্ডুই না ছিলাম!তো চম্পঝারণে এসে কিছু একটা হল...এ রকম বনাদৃত শুনশান স্টেশন আমি আগে দেখিনিঃ


পাহাড় ছুঁয়ে আছে সমান্তরাল যাচঞা আর আমরা এক অস্তিত্ববিরোধী চায়ের দোকানে,যেখানে পকৌড়াও ছিল!চোখ ঘোরাতেই  দেখলাম স্টেশনের দেওয়ালে লেখা,দুনিয়াকে মজদুরোঁ এক হো,পাশে ওড়িয়াতে,দুনিয়ার মজদুর এক হুও!আমি নিজেকে তখন আমার বন্ধুদের চেয়ে রাজনৈতিক চেতনায় এগিয়ে থাকা ভাবতে আরম্ভ করেছি,আমার বন্ধুরাও একটু যেন সমীহ করতো আমায়,এটা আমার সঙ্গে থাকা ভারী ভারী বইগুলোর কারণেও হতে পারে!আমি তাদের বলতে পারিনি যে আমার বৌদ্ধিক নৈস্তব্ধের কাছে এই বইগুলোর সমবেত কলস্বর নিঃসঙ্গ হয়ে যায়,আমি প্রায় সময়েই ওই বইগুলোর সম্ভাবনার দিকে তাকিয়ে গেয়ে উঠি,কি করি আমি,কি করি,বল রে সুবল বল দাদা....তো ওই সময়ে দাদা থাকাটাই স্বাভাবিক,১৯৭০!দাদারা রাজনৈতিক না হলে আর দাদা কিসের?তারা আমায় জানাতো সেইসব প্রবল শ্রেণীসঞ্জাত ঘৃণার কথা,ভালবাসার কথা!আমার রক্তে শ্রেণীচেতনার লু বয়ে যেত!

সেই আমি,ক্লাস নাইন আবার ক্লাসলেস সোসাইটির স্বপ্ন দেখা সেই আমিই ধাক্কা খাই ওই চায়ের দোকানের মালিকের কাছে এটা জেনে যে স্থানীয় আদিবাসীরা গরমের সময়টায় বেশিরভাগ দিনই না খেয়ে কাটায়!তাদের মেয়েরা জঙ্গল থেকে জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ করে নিজদের কুড়িয়া তে এসে হয়তো দেখে খাওয়ার তো নেইই,খাওয়ার জলটুকু পর্যন্ত নেই!কেউ কেউ রাউরকেলা যায় দিনমজুরি করতে,অনেকেই ফেরেনা!সরকারি/মিশনারি স্কুল আছে কয়েকটা,সরকারি স্কুল ছাত্র পায়না,মিশনারি স্কুল যে কটা আছে,চলে!তবে প্রবল দারিদ্রের কারণে অনেকেই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে কাজ খুঁজতে বেরোয়!বারসূয়াঁ মাইন্স আর রাউরকেলার শিল্পাঞ্চল টেনে নেয় তাদের!Capital is dead  labour,which vampire like, lives only by sucking living labour, and lives the more, the more labour it sucks মাথার ওপরে সূর্য আরেকটু হেলে পড়ে,আমিও আরেকটু হেলে পড়ি কার্ল মার্ক্সের দিকে!

সাইকেলে আবার,যেতে যেতে হঠাতই মনে হয় যে শীতের এই দুপুরে মন্থর দুঃখের চোরাস্রোত বইছে,এ এমন যে গল্পে আসবে না,আবার এতটাই সঞ্চারমান যে কবিতায় পিছলে যাবে!একটু ফিকে হয়ে যায় থ্রিলার,হারিয়ে যাওয়া ডায়েরির পাতায় ফরফর করতে থাকে এক তরুণ গোয়েন্দার আচমকা উজিয়ে ওঠা খিদে,মনে হয় আর কতদুরে দেওদারঘাট,  খিদে যে বেশরম হয়ে উঠছে!

কোথায় যেন পড়েছিলামঃwhat a pity,even a dying man must eat!পরে এই খিদের নন্দন বহির্ভূত নান্দনিকতা বাংলা সাহিত্যে এনেছিল হাংরি জেনারেশন,অনেক পরে যখন আমি কবিতামনস্ক হয়ে উঠছি তখনো হাংরি বিস্ফোরণ আমায় বিস্ফোরক করলো না,হয়তো মানসিকতায় ভৌগলিক আপেক্ষিকতার দূরত্ব ছিল!আমার কাছে এখনো বিস্ময় হল কবিতা,মেট্রোশিহর নয়,এমনকি অপ্রমাণিত তীব্র যৌনতার রাহগীরিও নয়, হয়তো ওই চম্পাঝারণ স্টেশনের বিলম্বিত দুঃখ আর ফলপ্রসূ মানবিকতার হাতেগরম অনুভূতিই কবিতাকে অদৃষ্ট করে তোলে আমার,আজ যখন প্রাতিষ্ঠানিক রাজনীতি আমার কাছে একমাত্র হয়ে নেই,যখন মনে করি দল মানুষকে তার দলের সীমানা অব্দি মানবিক করে রাখে,কবিতা নয় কবিতার বিষয় হয়ে ওঠে প্রচারের মহিমাপুঞ্জ,তখনো আমি অদৃষ্ট কবিতাকে খুঁজতে থাকি,চেতনা হোক বা তার অতিচলন,আমি তো দেখিনি!ওই নালেখা কবিতার নতুনাঙ্গে আমি কিন্তু এক স্বয়মাগত অর্বাচীন,চেতনা বোধহয় সেই অনিয়ন্ত্রণ যার বাহুল্যে আমারো কষ্ট হয়,যা না থাকলে মনে হয়,কবিতা কোথায়?এতো কংক্রিট!

তো সাইকেলের প্যাডেলে গোটানো রাস্তা দিয়ে কবিতা আমায় প্রথম ছুঁয়েছিল,প্রথমিক কারিগরির ছন্দিল বালখিল্যতা নয়,আজ বুঝি সে ছিল কবিতা নাম্নী এক নিয়তির ছোঁয়া,যাকে কবিগুরু ঠিক চিনেছিলেন,মাধুরী..অধরা মাধুরী!                    








              

নীলাব্জ চক্রবর্তী

সহলিপি নিয়ে যা যা আমি ভাবতে চেয়েছিলাম


তাহলে বরং ভাবি ভাষার সহলিপি হোলো আগুন আর বরফের সহলিপি ওই হাওয়াকলের ব্লেড পানীয়বোতলের গায়ে সাঁটা করিনা কাপুরের ছবির সহলিপি নিশ্চয়ই ওই স্টিকারেই তার পাশে ছাপা বারকোড তবে বড়দিনের সহলিপি কিছুতেই ফ্রুট কেক নয় এরপর থেকে কখনো কখনো আমি অসহলিপির কথাও ভাবতাম... কৌরব-১১১ রেফার করে বা না করে...





সিনেমা থেকে রোদ কেটে আনছি
রোদের আঠা
আর ছবি বুলিয়ে              ঘন করছি
দেখছি
মাথায় অভিধান নিয়ে
লোকেরা রাস্তা পার হচ্ছে...

আরে! তুমি দেখছি অনুষঙ্গ-স্মৃতি-কোলাজ-সহলিপি সব একাকার করে ফেলেছো নীলুবাবু! এভাবে হবে? এইসব মায়ামেদুর গোলগাল কথাবার্তা ছাড়ো এবার...

হুম... তা হবে... তবে এখন সে করে কী! লিখতে বসলেই এইসব ক্লিশে আর ক্ষয়ে যাওয়া অক্ষরমালা টানতে থাকে তাকে... মোবাইল ফোনে জমা হতে থাকে একটার পর একটা ছোট ছোট অডিও ক্লিপিং... বারো পনেরো কুড়ি চব্বিশ সেকেণ্ডের... ওরা সবাই কোনও না কোনও একটা লেখার সহলিপি প্রাকলিপি... এখন লিখতে লিখতে উপাংশ ভেঙে যে যার দিকে চলে গেলে কী হয় সে জানেনা... সাইন থিটা আর কস থিটায় ভেঙে যাওয়া সেই লিখনপ্রক্রিয়া কি পরস্পরের সহলিপি? হতেও পারে ভাবতে ভালো লাগছে তার... এই যে অফিস স্পেস... নীচু ডিভাইডারওয়ালা কিউবিকল... বাঁদিক দিয়ে আলো আসছে আর তার মনে পড়ে যাচ্ছে বেলঘরিয়া হাইস্কুলের চারতলায় ৩২ নম্বর ঘর... একটা ঘর অন্য ঘরটার সহলিপি... শুধু কয়েক বছর আগেপরে লেখা হয়েছে তাদের... অথচ খুঁটিয়ে ভাবলে মনে হতে পারত হাইস্কুলের কয়েকটা বাড়ি পরে মহাকালী গার্লস স্কুলই বোধ হয় বেলঘরিয়া হাইস্কুলের প্রকৃত সহলিপি... সমলিপি... এইভাবে একটা লুপ... কিন্তু একটা কমিটেড লুপের ভেতর সব সবটাই তো পূর্বনির্ধারিত সুতরাং মৃত, তার মনে হতে থাকে ইয়োর অনার... তার জন্য সওয়াল-জবাব জারি থাকে... আর তার হাতনোটে বারবার জমা হয় ছেঁড়া ছেঁড়া ক্লিশে হেমন্তকাল... পেরিয়ে যায় আর দ্যাখে শীত আসছে পুরনো আলুর চপের দোকানের ডালায় শীত আসছে দেওয়ালে টাঙানোর পর ভুলে যাওয়া আতসকাঁচে... পেরিয়ে যেতে হয়... আর সে ভাবে কাকে বলে সর্বস্ব? কাকে বলে সর্বস্ব দিয়ে লেখা? ফলিত কবিতা ক্রমশ তাকে নাকি ঠেলে দিয়েছে প্রান্তিক কবিতার দিকে আর প্রান্তিক কবিতা, ইন টার্ন, ফলিত কবিতার অবধারিত দিকে... কেউ কারও সহলিপি নয়, হয়ে ওঠেনি উঠবেনা... শুধু শুধুই সে লেখে আর ফেলে দেয়... নালেখা সমস্ত সহলিপি জুড়ে, ফলতঃ, বেড়ে উঠতে থাকে ব্যাকস্পেস আর ডিলিট

সহলিপির জন্য সহলিপি


অথচ এই ক্রমশঃ খাদক হয়ে ওঠা মর্বিডিটির মধ্যেও, এমনকি, সহলিপি নিয়ে লেখার ব্যাপারেও একটা সহলিপি তৈরী হয়ে যায় যেন ক্লাসনোট হয়তো এই সেই ভাবনা-স্কিমা যা কখনো মুগ্ধ করার মতো মনে হয়েছিলো ইংরিজি হরফে লেখা ওই ছোট টেক্সট ফাইলটাই আসলে এই সহলিপি নিয়ে যা যা আমি ভাবতে চেয়েছিলাম-এর সহলিপি প্রাকলিপি


ওপরের এই ছবিতে
এই যে পাশাপাশি দুটো জানলা খুলে রাখা
নাকি দুরকম আলোবাতাস
একটায় সহলিপির কথা আসবে তার
আর একটার ভেতর দিয়ে
আলো তৈরীর কারখানার ভিত কতোটা
            গভীর হবে সেই গণিতব্যঞ্জন
এখন গভীরতা আর গভীরতাকামী একটা কবিতার ফারাক
ওই দুই জানলার চিরকালীন ফাঁকে
বসে থাকবে
তারপর
সহলিপির কথা লিখতে লিখতে
একবার তবুও ভাববো
উভলিপির কথা লিখবো কিনা
যেমন একটা উভমুখী প্রোটোকলের কথা...

সহলিপির নমুনা

মিশ্রভাবনাগুলো

ওখানে হর্ন বাজানোর গন্ধ
হাওয়াকলের ভেতর বাইরে
ঝিরঝির করছে               আলোর মন্তাজ
আর
একটানে নীলি নদী কে পরে
লিখে রাখার জ্যামিতিটুকু

>> --- অলীক শহর থেকে --- <<

আরও লম্বা হয়ে একটা হ্যালোওওওও
কীভাবে প্রোজেকশন ফেলছে ছোট রাস্তায়...

একটা ঢালু ট্যাক্সি যেভাবে সিঁদুরগন্ধ গুঁড়োগুঁড়ো হয়ে যায় আমাদের সেতুবিষয়ক ভাবনাগুলো কামড়ে কামড়ে, ক্রমশ, হেমন্তকালের মধ্যে ঢুকে যাচ্ছিলো হাতের তালুতে হারিয়ে যাওয়া একটাই স্মৃতিমুখর বর্ণহীন অপেরাহাউস অথচ ব্রা-এর হুক, গলে যাওয়া একেকটা কাটা বাক্য আর ধীরে শক্তপোক্ত হয়ে ওঠা ওই পোড়ো বিকেল... সবাই মিলে একটাই ভেজা সিম্ফনি অথচ, আমি কোনোদিন কাউকে বিয়ে করবো না... তোমাকেও না... এতদূর দূরের কথায় মৃদু ডাকটাইল হয়ে আসে নির্বাচিত ব্যবহারসমূহএকটা বারান্দামুখী রাস্তা যখন ম্যাটিনি আর ইভনিং-এর ছায়া ওভারল্যাপ করে আর একটা মিহি কোলাজ থেকে একটা একটা করে ঝরে পড়া পীত অক্ষরগুলো... আসলে তুমি বরাবরই আমায় টেকেন ফর গ্র্যান্টেড ভেবেছ... যা খুশি তাই করেছ... আসলে ওই রাস্তাগুলোতে অন্য কারো ছায়া লেগে ছিল অন্য কারো আলোবাতাস রেখাচিত্রের যে দিকটায় আলো পড়েনা... দুটো অসমীকরণের সাধারণ সমাধান অঞ্চল... পেন্সিল ঘষতে থাকি ঘষতে থাকি আর কোথাও ঘন হয়ে আসে একেকটা ডার্করুম এফেক্ট


কৃতজ্ঞতা : কৌরব



মলয় রায়চৌধুরী

এই যে, এই ভাবে উদ্দীপক




           আথ্রারাইটিসের পর আর কলম ধরে লিখতে পারি না; যখন পারতুম তখন শব্দ, বাক্য, ছবি ইত্যাদি লিখে রাখতুম ডায়েরিতে, পরে কবিতা বা গদ্যে কাজে লাগাবার জন্য। এখন এক আঙুলে কমপিউটারে টাইপ করে লিখি। তাই আমার এখনকার সব লেখাই খামখেয়াল স্কুল অফ পোয়েটিকস প্রসূত, শীতেল বিদ্যুতের ঝাপট লাগে, কমপিউটারে বসি, লিখতে থাকি; কবিতার ক্ষেত্রে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এক সিটিঙে। কবিতাটা নিয়ে ভাববার যেটুকু সময় তা হল রাতে স্লিপিং পিল খাবার পর তন্দ্রার মধ্যে ঢুকে পড়ার মাঝে সময়টুকুতে পাওয়া স্মৃতি
        এই যে, এই কবিতাটা, যার শিরোনাম অবন্তিকা তোর ওই মহেঞ্জোদারোর লিপি উদ্ধার”, এটা লেখার উদ্দীপকের কাজ করেছে একজন গণিতবিদ তরুণী কবির সঙ্গে আলাপ। তিনি নামকরা সংস্হার সফ্টওয়্যার ইনজিনিয়ার এবং একই সঙ্গে ইনডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্সের ফেলো। তিনি দুটি কবিতা লিখে জানিয়েছিলেন যে সেগুলো আমাকে নিয়ে লেখা। কথাপ্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন যে জনৈক গবেষকের সহায়ক হিসাবে তিনি হরপ্পার অতিপ্রাচীন লিপি উদ্ধারের কাজ করতে চাইছেন। তিনি আমাকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন যখন, আমারও তাঁকে উদ্দেশ্য করে লেখা উচিত মনে করে ভাবতে গিয়ে মনে পড়ে গেল শৈশবের কথা।
          আমার বড়জ্যাঠা ছিলেন পাটনা মিউজিয়ামের কিপার অফ পেইনটিংস অ্যাণ্ড স্কাল্পচার; সেই সুবাদে স্কুলের ছুটি-ছাটায় ওনার সাইকেলের পেছনে বসে চলে যেতুম মিউজিয়াম। প্রবেশ অবাধ ছিল, প্রতিটি ঘরে সারাদিন কাটাতে পারতুম। হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর বেশ কিছু নিদর্শন ছিল একটা শোকেসে; শুনে আশ্চর্য লাগত যে কেউই ওগুলোর ইশারা জানেন না। বড়জ্যাঠা বলতেন, “ওগুলো চিঠি, তুই পড়ে বল কী লেখা আছে, চিঠি লিখে সিলমোহর দেগে দেবার ছাপ, অন্য ঘরে যাবার আগে বলে যাবি। বিশ্বাস করতে অসুবিধা হতো না তখন।  
           গণিত সম্পর্কে আমার ভীতি চিরকালের। ইনটারমিডিয়েটে গণিত ছিল যা বাদ দিয়ে ইকোনমিক্সে সান্মানিক স্নাতক পড়তে গিয়ে দেখি গণিত সেখানেও পিছু ধাওয়া করেছে। স্নাতকোত্তরে ইকনোমেট্রিক্সে আমার অবস্হা একেবারে কাহিল; প্রথম হতে পারলুম না। অবশ্য, আমার বন্ধুসঙ্গ আর জীবনযাপনও তার জন্য কিছুটা দায়ি।
         কবিতাও সিন্ধু সভ্যতার অক্ষর আর সিলের মতন, পাঠক ইশারা খোঁজেন আর নিজে নির্ণয় নিতে পারেন, কবি ইশারার কী-কী ইউনিকর্ণ তাতে লুকিয়ে রেখেছেন তাতে পাঠকের বড়ো একটা কিছু এসে যায় না। পাঠক সিলের রহস্যের আহ্লাদে আক্রান্ত হন। ইনডাস স্ক্রিপ্টের কারিগরদের মতন কবিও তাঁর কাজ থেকে উধাও। পাঠক যা ইচ্ছা বুঝুন।
         গণিতবিদ আর সফ্টওয়্যার বিশেষজ্ঞ একজন তরুণী কবি,  আর তিনি সিন্ধু সভ্যতার আড়াই-তিন হাজার বছর আগের লিপি উদ্ধার করতে চাইছেন, স্লিপিং পিলের তন্দ্রায় এটুকু চিন্তাই ছিল বিস্ফোরক; তাঁর প্রতি ভয়-মিশ্রিত অ্যাডমিরেশান কাজ করছিল। উদ্দীপক হিসেবে পরের দিন সকাল থেকে মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল গণিতভীতি, সিন্ধু সভ্যতার ইউনিকর্ণ সিল আর অক্ষরগুলো, বড়জ্যাঠার উপদেশ, তাই নিয়ে বসে পড়লুম কমপিউটারের সামনে। অবন্তিকা একটি নির্মিত প্রতিস্ব। আমার পরিচিতাদের গুণাগুণের আতসকাচের আলোয় গড়া। রামী, বনলতা সেন, নীরা, নয়ন, সুপর্ণার মতন অবন্তিকা কবি-বিশেষের নিজস্ব নয়; তিনি স্বয়ংসম্পূর্ণ আর স্বাধীন। কবিতাটা শেষ পর্যন্ত এরকম দাঁড়ালো :

কী গণিত, কী গণিত, মাথা ঝাঁঝা করে তোকে দেখে
ঝুঁকে আছিস টেবিলের ওপরে আলফা গামা পাই ফাই
কস থিটা জেড মাইনাস এক্স ইনটু আর কিছু নাই
অনন্তে রয়েছে বটে ধূমকেতুর জলে তোর আলোময় মুখ
প্রতিবিম্ব ঠিকরে এসে ঝরে যাচ্ছে রকেটের ফুলঝুরি জ্বেলে
কী জ্যামিতি কী জ্যামিতি ওরে ওরে ইউক্লিডিনী কবি
নিঃশ্বাসের ভাপ দিয়ে লিখছিস মঙ্গল থেকে অমঙ্গল
মোটেই আলাদা নয় কী রে বাবা ত্রিকোণমিতির জটিলতা
মারো গুলি প্রেম-ফেম, নাঃ, ফেমকে গুলি নয়, ওটার জন্যই
ঘামের ফসফরাস ওড়াচ্ছিস ব্রহ্মাণ্ড নিখিলে গুণ ভাগ যোগ
আর নিশ্ছিদ্র বিয়োগে প্রবলেম বলে কিছু নেই সবই সমাধান
জাস্ট তুমি পিক আপ করে নাও কোন প্রবলেমটাকে
সবচেয়ে কঠিন আর সমস্যাতীত বলে মনে হয়, ব্যাস
ঝুঁকে পড়ো খোলা চুল লিপ্সটিকহীন হাসি কপালেতে ভাঁজ
গ্যাজেটের গর্ভ চিরে তুলে নিবি হরপ্পা সিলের সেই বার্তাখানা
হাজার বছর আগে তোর সে পুরুষ প্রেমপত্র লিখে রেখে গেছে
মহেঞ্জোদারোর লিপি দিয়ে ; এখন উদ্ধার তোকে করতে হবেই
অবন্তিকা, পড়, পড়, পড়ে বল ঠিক কী লিখেছিলুম তোকে--
অমরত্ব অমরত্ব ! অবন্তিকা, বাদবাকি সবকিছু ভুলে গিয়ে
আমার চিঠির বার্তা তাড়াতাড়ি উদ্ধার করে তুই আমাকে জানাস





অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

মেজাজটাই তো আসল রাজা

একটি কবিতা লেখার আগে ও পরে মনোভাব / আলোড়ন :

খুব স্বচ্ছভাবে জানি, একটা কবিতা লেখার আগে আমার মনে কোনো আলোড়ন হয় না। আলোড়ন হয় ভূমিকম্পের। কোনো দৈবিক কিছুওনা। শিহরণ-টিহরণ, আবেগ। নাহ্‌একজন রাজমিস্ত্রি যেমন আমার বাড়ির বাথরুমটা বানাবার আগে, সব মাপজোক করে দ্যাখেদেখে যায়, কত স্কোয়ার ফিট জায়গা। কত ইঞ্চির গাঁথনি। সিমেন্ট-বালি-বজরি-পাথর-ইঁট লাগবে কতখানিআমিও তাই-ই। বস্তত, কবিতা লেখাকে  পৃথিবীর আর-পাঁচটা কাজের চেয়ে এবং কবিকেও পৃথিবীর আরও সাড়ে পাঁচজন মানুষের চেয়ে আলাদা কিছু বলে বিশ্বাস করি না। একজন মাইক্রো-বায়োলিজিস্ট কিম্বা সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার যে কাজ করেন, যে সিরিয়াসনেস নিয়ে করেন, শিক্ষা-মেধা-চর্চা দিয়ে দক্ষ করে তোলেন নিজেকে, কাব্যচর্চাও তার চেয়ে আলাদা কিছু নয়। আলাদা কোনো মহত্ব দাবি করার কিছু নেই এতে। লিখতে গেলে আমার যেটা লাগে, মেজাজ। কিছু কাজ করার মেজাজ। ব্যস। এই মেজাজটা কখনো নিজে থেকেই এসে যায়। কখনো তাকে তৈরি করতে হয়। নিজেকে প্রস্তুত ও যোগ্য করে তুলতে হয়, কাজটার জন্য। পারিপার্শ্বিকে কবিতা টের পাওয়ার জন্য এবং মাথার মধ্যে কবিতার রসায়নটা ঘটতে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশ ও আবহাওয়াটা বজায় রাখতে হয় মাথায়, মনে নিজের সামনে একটা সমস্যা তৈরি করে সেই সমস্যাকে ভাঙবার একটা খেলা। লেখার মধ্যে এটাই উপভোগ করি আমি সবচেয়ে বেশি।     
Craftsmanship  এটাই, এটুকুই শিল্পের সবকিছু। আমার বিশ্বাসে। তবে, ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন জিনিস ট্রিগার করে একটা লেখার জন্য। সবসময় যে ট্রিগারের জন্যে অপেক্ষা করি তাও নয়। ট্রিগারিত হতে তো আমিও চাই। তাই ট্রিগার খুঁজেও নিতে হয়। এ যেন অমিতাভ মৈত্র-র সেই কবিতার বইটির নাম, বিদ্ধ করো, তীর। তাই, নিজেকে vulnerable রে তুলতে হয়, ট্রিগারের সামনে, জীবনের কাছে, কবিতার কাছে। এসো, আমাকে আঘাত করো। কখনোই যেহেতু একই সময়ে একটাই কাজ আমি করি না, ফলে মাথাকে বেশ কয়েকটা আলাদা প্রকোষ্ঠে ভাগ করে তাদের দায়িত্ব ও কাজ আলাদা করে ভাগ করে নিই। ফলে একটা বা দুটো লেখা একই সাথে লিখতে লিখতে কোনো ফোন রিসিভ করতেও আমার কোনো সমস্যা নেই। বিরক্তিও না। অবশ্য যদি ফোন ধরার মেজাজটা থাকে। আমার যা কিছু আয়োজন, যা কিছু আয়াস তার বেশিরভাগটাই এই মেজাজটাকে তৈরি করতে।
শিল্প একটা সেরিব্রাল জব। মস্তিষ্কেই তার ল্যাবরেটরি। মস্তিষ্কেই তার টের পাওয়া থেকে প্লেজার, সবকিছু। আরেকটা জিনিস, একজন ইলেক্ট্রিক মিস্ত্রির যেমন টেস্টার। কোন্‌ পয়েন্টে কারেন্ট আছে কোন্‌ পয়েন্টে নেই, তা বুঝতে তিনি ব্যাগ থেকে টেস্টারটি বের করেন। আমি খাড়া করি কান। যদি কোনোদিন অন্ধও হয়ে যাই, বধির যেন না হই কখনো। শব্দ। শব্দ। মাঝরাতে হিম পড়ার শব্দ থেকে ব্লেড দিয়ে কড়াইয়ের কালি চাঁছার শব্দ, বেড়ালের গোঙানি, বঁটিতে আলুর খোসা কাটার শব্দ, দেশলাই জ্বালাবার ফস্‌স্‌স্‌ থেকে প্রতিমা বড়ুয়ার গানের ঢোলক, দোতারা কিশোরী আমোনকরের গলা। পৃথিবীর সব শব্দ যদি শুনে যেতে পারি, পৃথিবীর সব দৃশ্য সব রঙ কল্পনা করা যেতে পারে।   
আর, একটা কবিতা লেখার পরের মনোভাব? রাত জেগে অফিসের প্রোজেক্ট শেষ করে আপনার যা মনে হয়, যা অনুভূতি হয়, আমারও আলাদা কিছু নয়।      

কবিতার নির্মাণ-বিনির্মাণে রান্নাঘর বৃত্তান্ত :
উৎপাদন প্রক্রিয়া প্রদর্শন করলে তা অশ্লীলতা সমীর রায়চৌধুরী  

কবিতার উৎসমুখ ও কলম বনিবনা বে-বনিবনা :  
গৌতম বুদ্ধের একটা কথা দিয়ে আমি এটাকে ভাবার চেষ্টা করি। আগেও যতবার এই বিষয়টা নিয়ে ভেবেছি, বুদ্ধের এই কথাটাই মনে এসেছে'চৈতন্য আত্মার আগন্তুক ধর্ম'এই ছিল বুদ্ধের কথাটা। এবারে, সেই মূল উৎসমুখ, সেটাকে যদি 'আত্মা' ধরি, তাহলে তার কিন্তু চৈতন্য নেই। তাকে চৈতন্য দিতে হবে। এই মূলকে সংবেদনে পাই। এটা কবিতার র-ম্যাটার হতে পারে। কিন্তু সেটা স্বরূপতঃ নিষ্ক্রিয়, নির্গুণ, চৈতন্যহীন। আমার বুদ্ধি, জ্ঞান, বোধশক্তি, অভিজ্ঞতা, স্মৃতি, উপলব্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি এই ম্যাটারে আকার দেবে। প্রাণ দেবে। ঠিক নদীর জলে যেমন স্রোত এলে তবেই তা প্রবাহিত হয়। এক স্থান থেকে অন্যত্র যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে জল, স্রোতগুণ পেলে আত্মা এবং চেতনার মধ্যে যতটা বন্ধুত্ব এবং বৈরীভাব, কবিতার উৎসমুখ ও কলম বা কী-বোর্ডের মধ্যেও, ততটাই।  






আলোক সরকার

নিজের দর্পণে নিজের কবিতা      
                 
যা আছে তা থাকার সঙ্গে আছে, স্মৃতির সঙ্গে থাকা, স্বপ্নের সঙ্গে থাকা। থাকা অর্থাৎ নির্বাচিত থাকা, যে নির্বাচন জীবনের, জীবনযাপনের প্রশ্নে সদর্থক, অভীপ্সা, স্বতঃস্ফূর্ত, তার দিকেই আমার সমর্থন, আমার পক্ষপাত--- জীবনযাপন অর্থাৎ নানাবিধ অভিজ্ঞতা, তার এক অংশ বিরুদ্ধ শক্তি। তার দিকে আমার আগ্রহ অক্রিয় হয়, আমার টান তার দিকেই যা আমার জীবনকে রচনা করেছে, লালন করেছে। তা এমন একটা অনতিক্রম যাকে অতিক্রম করলেই আমার ভ্রমণ লক্ষ্যহীন অনাশ্রয়, ধুলোর সঙ্গে ধুলো, সাদার সঙ্গে সাদা। আমার চরাচর আমার থাকার অনিবার্যতার আনুকূল্যে নিশ্চিত হয়, ভাষা রচনা করে, ভাষা অর্থাৎ শব্দ-সঞ্চয়ন, ভাষা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক, ব্যক্তির সর্বস্ব, একটা শব্দের পাশে আর একটা শব্দের সচেতন সংস্থাপন--- সঙ্গে সঙ্গে ধুলো অবারিত হলো, নদী নৃত্যবিহ্বল। কালবৈশাখী, পূর্ণিমা নিশি। যা আছে তাকে অতিক্রম করে, সেই অস্পর্শ, অবধারিত এখন, এখন আরো বিশুদ্ধ, সেই মাতৃভূমি যা দিন রচনা করেছে, লালন করেছে।



আমি আমার নিজের কবিতাকে সামনে রেখে কথা বলছি। সেই কবিতাগুলি নিয়ে যা আমার যতো চেনা তত অচেনা, সেই কবিতা রচনার আড়ালে আমার কোনো দুঃখ কষ্ট ছিলনা, তাড়না ছিল না, কেবল একটা সখ, একটা ঝিমুনি আর একটানা থাকার কথা। না থাকাটাকেও আমি ঠিক চিনতে পারছি না, ওই একটা খেলা--- একটা নিমগ্নতা।



অনেক দিন আগে, তা প্রায় ষাট বছর আগে, নিজের কবিতা প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে লিখেছিলুম, আমার কবিতার সঙ্গে আমার জীবনের কোনো যোগ নেই--- জীবন অর্থাৎ জীবনের ঘটনাবলী। তা দীর্ঘ আলোচনা চায়ছোট করে জানাই, প্রাত্যহিক দুঃখকষ্ট, অভাব অনটন, সাফল্য অসাফল্য, এমনকী জননীর মৃত্যু, পিতার মৃত্যু, বিচ্ছেদ মিলন ইত্যাদিকে আমি কখনো আমার কবিতার বিষয় করতে প্রলুব্ধ হইনি। একইভাবে সমাজ-সংকট, মন্বন্তর, স্বদেশের পরাধীনতা-স্বাধীনতা। দেশবিভাগের বিষয়েও আমার কবিতা কখনো কৌতূহলী হয়নি। সমাজের রোগ-ব্যধিগুলিকেও অবান্তর করেছে। অতীব দারিদ্রের মধ্যে আজীবন যাপন করলেও আমার কবিতা তা নিয়ে আবেগ অভিযোগে বিহ্বল হয়নি। আমি খুব সহজেই কবিতা রচনার প্রথম শুরুর প্রভাত বেলা থেকেই নিশ্চিত বুঝেছি--- কবিতার একমাত্র এবং অদ্বিতীয় লক্ষ্য একটা কবিতা হয়ে ওঠা, আর কিছুই নয়। এই সম্পূর্ণতাকে পাওয়ার অন্যতম সোপান একটা শব্দের পাশে আরেকটা শব্দের অভিক্ষেপ। শব্দের সঙ্গে দ্বিতীয় শব্দের সঠিক বিবাহ।




নিজের কবিতাকে সামনে রেখে এইসব কথা বলছি। সেই কবিতাগুলিকে নিয়ে যাদের প্রসঙ্গে আমার কোনো ক্ষোভ নেই, ব্যর্থতা বোধ নেই। মনে রাখতে হবে এই উক্তি কেবল নিজের কবিতাকে ঘিরে।