অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
লেখালিখি
শুরু : ২০০২-০৩ থেকে।
প্রকাশিত বই : ‘২০
মিনিটের জন্য সুমিত্রা মুখোপাধ্যায়’
(২০০৪), দৌড় প্রকাশনী
‘ডাক্তারকে যা বলেছিলাম’
(২০১৪), বৈখরী ভাষ্য
‘উন্নয়ন বিরোধী যেসব ক্রিয়াকলাপ এখন শহরে হচ্ছে’ (২০১৫) – ইবুক, বাক্ প্রকাশনী
সম্পাদনা : ‘অ্যাশ্ট্রে’ এবং
‘ইণ্ডিয়ারি’। ‘বাক্’ পত্রিকার ‘অন্য
ভাষার কবিতা’ বিভাগের বিভাগীয় সম্পাদক।
ভালোলাগা : বই পড়া, বাজার করা, থিয়েটার, ভারতীয় রাগ সঙ্গীত, দেবব্রত বিশ্বাস, প্রতিমা
বন্দ্যোপাধ্যায়, কবীর সুমনের গান, কিশোরী আমোনকর, নিখিল ব্যানার্জির সেতার, বাঙলার
লোকগান এবং মদ্যপান।
যোগাযোগ : arjunbanerjee1985@gmail.com
পুঁই ডাঁটা আর বৌ-শাক
অথবা লুঙ্গি ও আমার যৌনজীবন
অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
১.
বাঁধাকপি,
সজনে ডাঁটা, ঢেঁকি শাক, লাল শাক, পুঁই শাক, লাউডগা, উচ্ছে, ঢ্যাঁড়শ, ঝিঙে, হলুদ,
সয়াবিন (বড়ো দানা), এঁচোড়,
মোচা, কাঁচা ছোলা। গম। সকাল সকাল আনাজ-সব্জির বাজারে গেলে একটা সবুজানুভূতি হয়।
শস্য্যানুভূতি হয়। এক একটা সব্জির রস মুখের ভেতর, জিভের বারান্দায়, টাগরায় খেলতে
থাকে। ব্যাগ উপচে নেওয়া শাক-পাতা-সব্জি নিয়ে, ব্যাগের ভারে একপাশে হেলে, হেঁটে
হেঁটে বাড়ি ফেরার সময়, কিম্বা হাত ব্যথা হয়ে গেলে এ’ হাত ও’ হাত বদলে ব্যাগ নিয়ে ফেরার
সময়, যে ঘাম সমূহ আমার বুক গলা ঘাড় চুঁইয়ে নামতে থাকে, নামতেই থাকে, আর আমি হাঁটতে
হাঁটতে টের পাই ঘাম গজাচ্ছে, মনে মনে ভাবি ঢেঁকি শাকটা কেনা হ’ল না। বলতে বলতেই দেখি ফুটের ওপর একটা বৌ বসেছে মাথায় ঘোমটা টেনে, সামনে
বিছোনো শুধুই কয়েক আঁটি বৌ শাক। অদ্ভুত এই শাকটা দেখতে। সবুজ রঙের জংলা শাড়ি পরা
মাথায় ঘোমটা টানা একটা বৌয়ের মতোই। আর যে বৌ-টা বসে বেচছে ফুটের ওপর, সে-ও ওর’ম একটা শাড়ি পরেই ঘোমটা টেনেছে মাথায়। ঢেঁকি শাকের নাম যে কবে দিয়েছিলাম বৌ
শাক কে জানে। বাড়িতে এখন এই নামটাই চালু হয়ে গেছে। এখন ব্যাগে ক’রে বেশ কয়েক আঁটি বৌ নিয়ে যাচ্ছি আমি। রাস্তায় কোনো গাছের পাতা শুকিয়ে ঠা
ঠা হয়ে প’ড়ে থাকতে দেখলে, সেটাকে মাড়িয়ে
দিলে কড়রমড়র যে শব্দটা পায়ের নীচ দিয়ে স্নায়ুতন্ত্র বেয়ে মাথায় গিয়ে ওঠে, সেই
ধ্বনির কাছে এবং তার এই শরীরী যাত্রাপথে আমি কবিতা স্পষ্ট টের পাই। বৌ শাক, বড়ো
দানার সয়াবিন, মোচা, সজনে ডাঁটা, পুঁই ডাঁটা, গম— এই নামগুলোর মধ্যেই তাদের চিবোনোর সময়কালীন রসগুলো আছে। অথবা, আমার
খাদ্য-স্মৃতি এদের নামের মধ্যে সেই রসগুলো প্রেরণ করেছে। একবার ভেলোর থাকার সময়,
সারা ভেলোর বাজার চষে ফেলেছি লাউডগা খুঁজে। পাইনি। কি হা-কাঙালের মতো সেবার আমার
লাউডগা খেতে ইচ্ছে করছিল। পেলামই না। শেষে দু-দিন ধরে মনে মনে ভাবলাম আমি লাউডগা
খাচ্ছি। তার ডাঁটার রসগুলো স্মৃতি থেকে জাগানোর চেষ্টা করলাম। জিভ ভ’রে গেলো লাউডগার রসে। খুব লক্ষ্য ক’রে দেখেছি বাঙলা কবিতায়
দু-তিনজনের কবিতা প’ড়ে আমার ঠিক এই অনুভূতিটা হয়।
যেন সারারাত ভিজোনো এক মুঠ কাঁচা ছোলা মুখে পুরে চিবোচ্ছি। আহা। শব্দ, ধ্বনি,
ধ্বনির টংকার, টংকার নিংড়ে বেরোনো রস-সমূহ এবং তাদের রঙ ও গন্ধ— এ’ কি অসামান্য যৌনতৃপ্তি। এই
আনাজ ও দানাশস্যগুলো থেকে যে রতিক্রীড়া জেগে ওঠে এবং সজাগ-ইন্দ্রিয় হয়, কবিতা
তাদের আশেপাশেই ঘুরঘুর ঘুরঘুর করতে থাকে পায়ে পায়ে, বেড়াল ছানার মতো।
প্রত্যেকটি শরীরের নিজের জ্যামিতি থাকে। সেই জ্যামিতি হঠাৎ একটা যাদুতে পালটে গেলে মানুষ
পড়ে মহা ফাঁপড়ে। যেমন পড়েছিলেন গ্রেগর সামসা। রোজ তিনি বিছানা থেকে যেভাবে নামেন,
দরজার ছিটকিনি খোলেন যেভাবে, সব পালটে গেছে এক সকালে। নেফ্রটিক সিন্ড্রোমে দু’দিনে হঠাৎ দশ-বারো কেজি ওজন বেড়ে যাওয়ায় দেবাদৃতার কাঁধে হাত রেখে থপ্ থপ্
ক’রে হাঁটতে হাঁটতে যখন শেয়ালদা স্টেশনের সিঁড়ি ভাঙছি সেবার, বিশ্বাস করুন
কাফকা, আমার আপনাকে নয়, মনে পড়ছিল গ্রেগরকেই। কল্জে থেকে কুঁচকি সব তখন ফুলে
যাচ্ছে প্রত্যেক মুহূর্তে যেন। আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছি আমার এ-তো-দি-নে-র চেনা শরীর, তার প্রত্যেকটা
মাংশপেশী আজ অজানা হয়ে যাচ্ছে আমার নিজের কাছেই। সেবার বাসায় ফেরার পর থেকে শুরু
করলাম লুঙ্গি পরা। আহা লুঙ্গি। জামা-জুতো-চটি বেচারারা কেউই তো এঁটে উঠছে না গায়ে।
প্রতিদিন আমি আরো ফুলছি। বিছানায় পাশ ফেরার হিসেব-নিকেশও বদলে গেছে। চোখের পাতা ফেলা,
ঘাড় ঘোরানো, পা ফেলার মাপ, সবকিছুর সাথে নতুন ক’রে একটা বোঝাপড়া করে নিতে হচ্ছে তখন অর্জুন গ্রেগর বন্দ্যোপাধ্যায়কে।
অদ্ভুত এক কদাকার আকৃতি নিয়ে পুরুষাঙ্গ ফুলে ঝুলে আছে। সারারাতের ধুন্ধুমার
বৃষ্টির পর এক-কোমর জলে ফ্যালফ্যাল ক’রে দাঁড়িয়ে আছে
হৃৎপিণ্ড। ভেসে যাচ্ছে ফুসফুস। বৃক্ক। হেনলীর লুপ। এখন, শরীর আবার ফিরছে তার আগের
জায়গায়। কিন্তু লুঙ্গিটাকে ছাড়িনি। ঘরে, ঘরের বাইরেও। বিপদের দিনে পাশে ছিলিস তুই।
ছাড়া যায়! বরং কিনেছি নানা রঙ-বেরঙের লুঙ্গি। লাল। বাদামী। নীল। পরিষ্কার কাচা
লুঙ্গিতে যে খুব ভালো মাস্টারবেট করা যায়, শিখিয়েছিল ইন্দ্রনীল। নতুন এই পোশাকের
সাথে আমার যৌনজীবন যে এভাবে জড়িয়ে যাবে কে জানতো। যেভাবে যৌনতা হয় আমার বাজারের
ব্যাগে পুঁই ডাঁটা আর বৌ-শাকের। যেভাবে ব্যাগে সজনে ডাঁটাকে জড়িয়ে ধরে লাউডগা।
আমার যৌনতা আমার লুঙ্গির সাথে।
২.
গ্রাম
উথলে ওঠা এই বৃষ্টির বাইরে প’ড়ে
আছে তিনতলার মাঠ
মাঠের
ওপর এক ত্রিমাত্রিক ট্রাক—
চাকা ও পরিত্রাণ খুলে শ্বাসকষ্ট দিয়ে
মেখে খাচ্ছে রুটি
অর্ধেক
ভাঙা জিভ, ছেঁড়া দাঁত, মনে করো পেরিয়ে যাচ্ছে এই কবিতাটা
বৃষ্টিনির্মাণকারী
শ্রমিক। তোমার বাজনা এবারে ধাতু ও পতঙ্গ হোক।
শরীরের ভেতর বড়ো হচ্ছে জল জমার দেশ, শ্যালো ও
সেচ ব্যবস্থা
আমাকে
এবার কেউ ধানের ধ্রুবক মনে করিয়ে দাও
৩.
চেন্নাই
থেকে ফিরছি। কলকাতা। বিকেল চারটে পঞ্চাশের ফ্লাইট। AI-766,
জানলার ধারে সীট। রিনির কাছ থেকে নিয়ে এসছিলাম, আর্যনীল মুখোপাধ্যায়-এর ‘কিনারার রূপকথা’। জানলার সেই কিনারায় ব’সে পড়ছি। উড়ে যাচ্ছে প্লেন। কোথায় ব’সে আছে আর্যনীল
মুখোপাধ্যায়। ঠিক এই মুহূর্তে ওর একটা বই পড়ছে কেউ, মাটি থেকে অনেক ওপরে, আকাশে
তখন রূপকথার রঙের মতোই রঙের পর রঙ ছড়াচ্ছে সন্ধে। প্লেনশুদ্ধু লোক বাঁদিকে মুখ
ঘুরিয়ে অবাক হয়ে দেখছে সেটাই। আমার পাশে বসা দুই তরুণ বার্মিজ দম্পতি। অনেক
চেষ্টাতেও খুব একটা আলাপ জমাতে পারলাম না যাদের সাথে। সবার সন্ধে দেখার ফাঁকে তাঁরা
নিজেদের ব্যাগে লুকিয়ে নিলেন এয়ার ইণ্ডিয়া থেকে দেওয়া টিফিনের চামচ দুটো। আমি
আকাশের নীল থেকে আর্যনীলে ফিরে এলাম। মাটি থেকে এতো ওপরেও মানুষ চুরি করে। কলকাতার
আকাশে যখন ঢুকেছে প্লেন, সন্ধে হয়ে গেছে। রাস্তায় রাস্তায় বাড়িতে বাড়িতে দীপাবলীর
মতো জ্বলছে আলো। কী মায়াবী। কী রূপকথা। এই ঘরগুলোর ভেতরে কি হচ্ছে এখন, কি কলহ, কি
বিচ্ছেদ, এই মায়ার আলো দেখে তা’ ভাবাও যায় না। ভাবতে
ইচ্ছেও করে না। কিন্তু কবি সতত গোয়েন্দাপ্রবণ। যদিও কবি এবং গোয়েন্দার মধ্যে প্রচুর
মিল দেখি আমি, তবু পদ্ধতিগত দিক থেকে মূলগত একটা পার্থক্য আছে। কবি চান রহস্যকে বাঁচিয়ে রাখতে। রহস্য তৈরি করতে।
কিছু তার দেখি আভা। কিছু পাই অনুমানে,
কিছু তার বুঝি না বা। এই রহস্যটা। আবার গোয়েন্দা চাইছেন রহস্যকে ভেদ ক’রে যেতে। দু’জনেই সত্যাণ্বেষী। তবে, আমার
মিথ্যেগুলোও তো আমার সত্যি। শিশুর ছবিতে আকাশের রঙ সবুজ, কাকের রঙ নীল হয়ে যায়
যখন, বোঝা যায় মিথ্যেটাকে তৈরি করতে হয়। কল্পনাশক্তি দিয়ে। পালিয়ে যাবার অলগলি
বাৎলে দিতে পারে এক একটা খানদানী জাঁদরেল মিথ্যে আমার। দিয়েওছে। আজও দেয়। প্লেন থেকে নীচের বাড়িগুলোকে যখন দেখি, তার দেখা
না দেখায় মেশা আভাগুলো দিয়ে কিছু পাই অনুমানে। কিছু বুঝি। কিছু বুঝি না। ছেলেবেলায়
যেমন, মা নাচ শেখাচ্ছেন বাড়িতে। আমি বিকেলে ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, উদ্ভিন্নযৌবনা দিদিরা ভারী বুক নিয়ে নীচু হয়ে
ঘুঙুর বাঁধছে, ঘুঙুরের
রিনিঠিনি আওয়াজ হচ্ছে। ক্যাসেটে
হয়ত বাজছেন মান্না দে। আমার মন কিন্তু চলে যেত
ওই দিদিগুলোর
দিকেই। মান্নাবাবুর গলা আমাকে সেখান থেকে নজর সরাতে পারেননি। মস্তিষ্কে কতকিছু এসে যাচ্ছে তখন একইসাথে।
ভালোলাগছে ওই ভারী বুকের দিকে অনিমিখে চেয়ে থাকতে। ভালো লাগছে ওই রিনিঠিনি ঘুঙুর।
তবলার বোল। বৃন্দাবন মে নাচত গিরিধারী। মেঝেতে পায়ের চেটোর চটাস্ চটাস্ আওয়াজ। আমার
ধ্বনিচেতনাও তৈরি হচ্ছে। ওই সময়েই সাবালক হচ্ছে যৌনচেতনা। দুপুরের ঘুমের সময়টা হয়ে
গেল আমার যাবতীয় কল্পনার সময়। যে দিদিটাকে তখন ভীষণ ভালোলাগছে, দুপুরের কল্পনায়
তার সাথে স্নান করছি সাবান মেখে। মাস্টারবেশন থেকে কবিতা অব্দি— আই অ্যাম দ্য মনার্ক অফ অল আই ইম্যাজিন। তার প্রতিটা ন্যারেশন
আমাকেই লিখতে হচ্ছে। হে তোমার শীৎকার, সেও আমারই
মস্তিষ্কজাত। তোমার স্পর্শও তৈরি আমাকে ক’রে নিতে হয়। আরো অনেকটা বড়ো হয়ে, এর সাথে আরেক অভূতপূর্ব পথ এসে
মিশলো। ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন সঙ্গী বা সঙ্গীনির কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে
ভালোলাগার মুহূর্তগুলোকে আলাদা আলাদা ক’রে তুলে এনে, একটা কোলাজ বানিয়ে এক ক’রে নেওয়া। এই যে কোলাজ থেকে একটা আদর-সমগ্র তৈরি হ’ল, এই অখণ্ড ও নির্বাচিত আদর-প্রণালি কারো মধ্যে ছিল না। পরে
বুঝেছি, যৌনতা এমন একটা এলিমেন্ট, অনেকটা সৌন্দর্য বা কুৎসিত যেমন, যেকোনো কিছুর
মধ্যেই থেকে যেতে পারে। কবিতাও তেমনি, থেকে যায়, যে কোনো আধারের ভেতর, লুকিয়ে
চুরিয়ে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ব্যথিয়ে। অনেক কিছুর মধ্যে।
৪.
নার্সারীতেই পড়ি বোধয় তখন। ইশকুল থেকে
ফিরে, বাড়িতে, সন্ধ্যায় পড়ছি, সি এ টি ক্যাট, ক্যাট মানে বেড়াল। ডি ও জি ডগ। ডগ
মানে কুকুর। এম এ এন ম্যান, ম্যান মানে মানুষ। বাবা গম্ভীর গলায় বলল, ‘বাবাই, ক্যাট মানে বেড়াল নয়। ডগ মানেও কুকুর নয়’। আমি ফ্যালফ্যাল ক’রে তাকিয়ে আছি লোকটার দিকে। বলে কি লোকটা। ‘ক্যাটের বাঙলা হ’ল বেড়াল। ডগের বাঙলা হ’ল কুকুর। ক্যাট মানে কখনও বেড়াল নয়। ডগ মানেও কখনও কুকুর নয়’। প্রত্যেকবার ‘মানে’ কথাটায় বাবা যে আলাদা ক’রে স্ট্রেস দেওয়ার জন্য ঠোঁটের ওপর চাপ দিয়েছিল, সেটা আমার
স্পষ্ট মনে আছে। শব্দের যে কোনো মানেই হয় না, সে একটা প্রতীক মাত্র, সে কিছুকে রেফার
করে, চিহ্নিত করে, কোনো কিছুর ‘মানে’ সে ব’লে দেয় না, এটা বোঝার বয়েস তখন
স্বাভাবিক ভাবেই নয়। বাবা আরো একটা মজার কাণ্ড ক’রে দিয়েছিল আমার জন্যে। খুবই ছোট তখন। বিভিন্ন জিনিসের নাম দিয়ে
দিত বাবা। যে জিনিসের যে নাম হওয়ার কথা ভাবাই যায় না। যেমন, আমার সেই ছেলেবেলার
হাওয়াই চটি। তার নাম হয়েছিল ‘সুন্দরী’। এবারে, ওইটুকু পুঁচকে একটা ছেলে, সে তার চটিটা খুঁজে না পেলে,
বাড়ি মাথায় ক’রে চিল্লিয়ে হাঁক পাড়ছে, আমার সুন্দরী
কইইইইইইইইইইইইই???? অনেকটা বড়ো হয়েও আমি হাওয়াই
চটিকে সুন্দরীই বলেছি। এও এক রঙ মিস্ত্রীরই কাজ। মিথের রঙ ভাঙা। পাশের বাড়ির এক
খুব রোগা ও রুগ্ন হিলহিলে দিদির নাম বাবা দিয়েছিল, ৎ। আমি বর্ণের, শব্দের আকার-আকৃতি,
অক্ষরচিত্র ও তার দেহগঠনকে অন্য গঠনে চিনতে শুরু করলাম সেই থেকে। বর্ণ, শব্দ, শুধু
তার ধ্বনি নিয়েই নয়, এরা এলো ত্রিমাত্রিক চেহারা নিয়ে। তাদের রঙ ও গন্ধ নিয়ে। কেউ
কেউ এলো জ্যান্ত মানুষ হয়েই। কোনো কোনো শব্দের স্বাদও আছে। তাদের আস্বাদন করা যায়।
এ’ এক synaesthetic কর্মকাণ্ড সমস্ত ইন্দ্রিয় এবং তার উপকূলবর্তী অঞ্চল জুড়ে। যৌনতা যেমন, সঙ্গম যেমন, সব ইন্দ্রিয়
কার্যকর ক’রে পেতে হয়। দৃশ্য, শ্রুতি, ঘ্রাণ,
স্বাদ, স্পর্শ সমস্ততে মিলিয়ে যখন পাওয়া, সেটাই তো আমার কবিতাযৌনজীবন।
ইন্দ্রনীল
ঘোষ
বইপত্রঃ রাত্রে ডেকো না প্লিজ (২০০৫), জুলাইওয়ালা (২০০৯), লোকটা পাখি ওড়া নিয়ে বলছে (২০১২), সার্চ করছেন দেবাঞ্জন (গদ্য, ২০১৫)
যোগাযোগঃ ghosh.indronil@gmail.com
নাহয় একটু খেলাই
হোক। একযুগ আগের এই লেখাকে লেখক আর পাঠক দু’জনেই
আবার পড়ুন। দেখা যাক, কে পালটে গেল –
ইন্দ্রনীল না ইন্দ্রনীলের যাপন !
এ’ মা – ন্যাংটো
যাপন তো একটা ব্যক্তিগত ব্যাপার – নয় কি? আমার যাপন, আমি share কেন করতে যাবো? তাছাড়া নিজের বেঁচে
থাকাটা নিজের কাছে হিরো-টোন ডিমান্ড করবে – এটাই স্বাভাবিক।
অথচ তা বললেই, পাবলিক বলবে – “বাঞ্চোত নিজেকে হারকিউলিস
ভাবে রে! আর রোজ রাতে হরলিকস খায়।”
সত্যিই ইন্দ্রনীল নিয়ে আমার বলার কিচ্ছু নেই।
কতটুকুই বা চিনি আমি ওকে! কতটুকুই বা একসঙ্গে থাকা! প্রতিটা লেখার আগে বা পরে আমি
রোহিত – রোহিত কুমার। যে কালো জামা পরে, কমলা প্যান্ট, মাথায় সবুজ
রুমাল, গলায় চেন, কানে দুল আর হাতে রাবারের ব্রেসলেট।
এখন প্রশ্ন, লেখার ঠিক কতক্ষণ আগে বা কতক্ষণ
পরে, লিখবে ভেবে তুমি কি ইচ্ছাকৃত সুইচওভার করো, তুমি writer না performer
ভাই? নিজেকে বাঁচাতে হয় এই ব’লে, যে আপনারা ভুল
বুঝছেন। আসলে রোহিত কবিতা মারে, মাখে, খায়, বাঁধে। অক্ষর থেকে অক্ষরে তাকে টার্গেট
ক’রে কেউ ছুটিয়ে যাচ্ছে। ক্রিয়া থেকে ক্রিয়ায় তার অনন্ত
লুকোচুরি। প্রতি রাতে নিশপিশ করে তার হাত পা। আরো লুকো আরো চুরি আরো আরো চুরি
লুকো। সবসময় সে নাড়াতে থাকে। কারটা? ধরো নিজেরটাই।
লেখার বেশ কিছু ব্যাপার আছে, বেশ কিছু ভণিতা।
অনেকগুলো ডিম একসাথে রেখে মুরগি যা দেয় তাকে বলে জড়ো তা। তো সেভাবেই ভণিতা বণিতা
ইত্যাদি। রোহিত এসবের ধারও ধারে না। গভীর রাতে হাওড়া স্টেশনে দাঁড়িয়ে সে তা দেয়
প্ল্যাটফর্মে। আর রাত ফাটে, কম্পার্টমেন্টের জেনেটিক আলো ফাটে, ঘুমিয়ে পড়া অসংখ্য
ফুটস্টেপ জেগে ওঠে। কেউ রেললাইন সেলাই করছিল। কলের শব্দে সমস্ত মানুষ, রাতের সব উৎকণ্ঠা
এক কোরাসের অংশ হয়ে যায়। আর সেই কোরাসের মধ্যেই রোহিত টের পায়, কেউ ছুটিয়ে চলেছে
তাকে। তাদের পায়ের শব্দ আশ্চর্য সব নোড তুলছে কোরাসে। শ্বাস নেওয়ার জন্য তার থামা,
হয়ে উঠছে সম্। দৌড়ে সে উঠে পড়ে কোনো ট্রেনে। ঢুকে যায় ভিড়ের মধ্যেকার এক চরিত্রে।
আগামী কিছুদিনের জন্য এই তার ঘর এই তার দীঘা।
বোহেমিয়ান? না ভাই, এ’ মিঞা বরং মিঞা কি মল্হার। উজবেকিস্তান, তাজাকিস্তান সবাই রাত ক’রে ট্রেনে ফেরে। আর এভাবেই রোহিত ম্যাপ শেখে ক্রমশ। একটা ফুঁ এর মধ্যে অজস্র
বাব্ল, দুটো বাব্লের মধ্যে অজস্র স্পেস, স্পেসের মধ্যে বাড়তে থাকা আলো, আলোর
থেকে ক্রমাগত মানুষ, মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ঋতু, ঋতুচক্রের মাঝে গড়ে ওঠা বিভ্রম,
বিভ্রমের ঘুমে নামছে ফুঁ। অতএব পৃথিবী গোল এবং ম্যাপ গণ্ডগোল।
এবার ইন্দ্রনীল প্রসঙ্গে আসি। আজ অবদি যা কিছু
ভালো শুনেছি সবই এর নামে। অথচ পাবলিক আসল ব্যাপারগুলোই জানে না। IIT Kharagpur থেকে M.Tech করেছে ইন্দ্র। কখনো এই institute-এ গিয়ে দেখো, – গেট থেকে বেরোনো গরুরাও
শিং উঠিয়ে চলে, রাস্তার ধারে সহজ ঘাস খায় না। ফলে ইন্দ্রনীল অহংকারী হবে না তো কে
হবে। প্লাস ওর চাকরি – সে তো আরেক উরিবাবা। বেড়ে ওঠার জন্য ইন্দ্রর
গাড়ি চায় বাড়ি চায় ফ্রিজ ওয়াশিং মেশিন সব চায়। এমন একটা ছেলের সঙ্গে বেশিক্ষণ কথা
বলা যায় না। কারণ এরা রিজিড। এদের অবয়ব ভারি স্পষ্ট। এরা ভূত হতে পারে না কোনোদিন।
সারাজীবন মাথার মধ্যে একটাই বাংলো নিয়ে কাটিয়ে দেয়।
রোহিত লিখতে পারে না ব’লে, আজও পেন দিতে হয় ইন্দ্রর হাতে। এ’ আমার কবিতার এক বড় দুর্ভাগ্য।
দুর্ভাগ্য আরো অনেক। আমি বিয়ে করতে পারছি না এদের জন্য। ভাবো, বউয়ের সঙ্গে
বিছানায়। রাতের অন্ধকারে আমি তো জানতেও পারবো না, আসল কাজটা কে করলো!
জন্মঃ ২ অক্টোবর, ১৯৮২।
বইপত্রঃ একটা দুটো অস্ত ( নতুন কবিতা প্রকাশনী, ২০১২ )
যোগাযোগঃ
astanirjan@gmail.com, ফেসবুক
অস্তিত্ব, কবিতা, ইত্যাদি
“It becomes possession; they
are part of you… ”
মাথায় টুপি, পায়ে মোজা, ডবল
ইনারের ওপর সোয়েটার পরে লেপের মধ্যে ডুবে আছি। নয়া দিল্লী। দু’ ডিগ্রীর কাছাকাছি ঠাণ্ডা। চোখ
বন্ধ করলেও শীত দেখা যায়। ঢুকে পড়ছে খুনির মত শাদা নিস্পলক তার অল্প হামাগুড়ি
তার...
ইদাহো,
উতাহ,
কলোরাডো…
এইবার ঘুমে ট্যান ধরলো, তার আগে
কিছু একটা ছেঁড়া ছেঁড়া ইংরেজি শব্দ শুনেছিলাম। এখন ক্রমাগত শুনছি আরো কয়েকটা
ইংরেজি... রিংটোনের মত বাজছে। চোখ মুছে আমি সামনের দিকে তাকালাম।লাইট অফ করা ছিল।
আর আমার কোনো নীল ভেপার নাইটল্যাম্প ছিল না।
ঘরটা একটা নীল ভুলকিতে ভরে আছে।
স্বচ্ছতোয়া আর একটু ভারী । ঘরের ঠিক মাঝখানে গোল হয়ে উড়ছে কতগুলো প্রজাপতি।তাদের
রঙ কালো। আর বেশ বড় একটা আদ্যিকালের ল্যান্ডফোনের রিসিভার ভেসে আছে হাওয়ায়। শান্ত
ও অভিজ্ঞ , সেটার রঙ কালো আর সেখান থেকে গুনগুন করে ঐ শব্দ গুলো আসছে
ইদাহো ,
উতাহ,
কলোরাডো…
বৃষ্টি হলে আমার সবসময় ভালো লাগত।
জল পড়ে যাওয়ার শব্দ, মাছ উঠে আসার শব্দ , ধুলো জমে যাওয়ার শব্দ। কতদিন আগে ভরভরা
বর্ষায় সোঁতার ধারে বসে কলাছোটে শামুক ভেঙে বেঁধে টোপ দিতাম, আর চিতি কাঁকড়াগুলো
দাঁড়া দিয়ে কামড়ে উঠে আসত ঐ শামুকের নরম মাংস বেয়ে। ওরা মাংসটা খেতে পারত না। শুধু
কামড় বসিয়ে উঠে আসত চুপচাপ অভিযোগহীন জেদি ...
হ্যালো...
আমি কথা বলতে
চাইনি, শব্দটা জাস্ট জাঙ্ক করল। আর ইংরেজি গুনগুনানিটা বেরোনো বন্ধ হয়ে গেল
রিসিভার টা থেকে।
হ্যালো...
আমি
সচেতনভাবে ডাকলাম এবার। আমার ভয় করছে না। নীল রং সোয়েটারের মধ্যে ঢুকে পুকুর
করছে...
হাই...
বহুদুর থেকে
অস্ফুট কিছু একটা।
ইয়ুপ...
অস্ত?
বলছি...
এখন সিগারেট ছাড়া তেমন কিছু নেই
আমার । দিল্লী আমাকে সিগারেট খেতে উৎসাহ দেয়। একা থেকে আরো একা। পকেটে হাত ঢোকালে
বোধহয় মানুষ একা হেঁটে যায়। একা পাশ ফেরে। সে ডিমসেদ্ধ আলুভাতে ভাত খায়। সে চেষ্টা
করে কবিতা লিখবে...সে একা আবদুল খান ই খাননের মুকবারায় গিয়ে বসে থাকে।তার পাকস্থলি
জুড়ে জমা হয় রেড লাইমস্টোন , হোয়াইট মার্বেল । কিয়স্কের গোল টুকু ঢেকুরের মত উঠে
আসে।
সে চেষ্টা করে
কবিতা লিখবে, তার টাকা নেই , পয়সা নেই তেমন শীত পোশাক নেই বাল বাচ্চা পরিবার
রেণ্ডী কিছু নেই... তুর বাল
“It
becomes a possession; they are part of you...”
দূর থেকে
আসতে আসতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে কথাগুলো – পাদ্রির মতো কেউ ঢেউ দিয়ে দিয়ে
যেন কাছে আসছে...
দিস ইস টেড
বাণ্ডি ,
জন্ম –
১৯৪৬
মৃত্যু –
১৯৮৯, ইলেকট্রিক চেয়ারে বসে
আমি চিনি
তোমায় , বালিশে ঠেস দিয়ে আমি বলে উঠি
কম্বলের
কোনাটুকু টেনে নি গায়ের আঁশে ।
যথেষ্ট কুয়াশা , মাখামাখি একটা
জবরদখল আর তার মধ্যে বৃষ্টি নেমেছে । বাসস্টপে দাঁড়িয়ে আছি, দ্বারকা সেক্টর -1 , কালো পিচের ওপর পড়ে যাচ্ছে
জল । গাড়ির মাঝে মধ্যে লাইটে তাকে আরো ঠাণ্ডা দেখায় । একটা 764 চলে গেল । ইচ্ছা করল না ধরতে ।
ভিজে যাওয়া বাসস্টপের গায়ে গাড়ির নম্বরগুলো লেখা। দেখলাম 764 এখনও একটু লেগে আছে সেখানে।
অ্যান আইস
পিক , ট্র্যাশ ব্যাগস , হ্যান্ডকাফ, এ ক্রোবার , এ স্কিমাস্ক, এ কয়েল অফ রোপ ...
আমি শব্দগুলো
ছড়িয়ে দিয়ে সামনে তাকালাম ।
টেড হাসলো...
বুঝতে পারছি ...হাসলো ।
হ্যাঁ ওগুলোই
, ওর হাস্কি গলাটা আমি শুনতে পেলাম।
একজন স্মার্ট
নীল টি শার্ট পরা লম্বা ফর্সা ঘনচুলের মানুষ হাসছে ।
অ্যাম আই এ
মার্ডারার ? আমি নড়েচড়ে স্পষ্ট হয়ে বসলাম ।
ফিসফিস করলাম
নীল আলোটার সামনে ,
“দ্য মোস্ট কোল্ড হার্টেড সন অফ এ
বিচ য়ু উইল এভার মেট দ্যাট আই অ্যাম দ্যাট য়ু টু, বাট এ পুওর মার্ডারার”
রাম কিনতে যাবার রাস্তায় আমি
বাল্বগুলি বাল্বগুলো দেখি, মোমোর দোকানগুলো, ফ্রুট জুসগুলোর জুস হয়ে ওঠার আগের
আকৃতি গুলো দেখি আর ভাবি জিনিসপত্র আজকাল আর ঠিকঠাক বাজছে না। ক্রমশ, একজন
মধ্যমেধার মানুষ, তার ভুতে পাওয়া, তার লিমিটেশন, তার বুঝতে পারা কুয়োয় পড়ে যাওয়ার
ভাব, সে চায়নি কোনদিনও কবি হবে বিখ্যাত হবে আর সে কেলিয়ে যাচ্ছে। সে মাঝে মাঝে
একলা ঘরে বসে হাঁফায়, কোঁকায়, মাথায় হাত বোলায়, সে সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য বাড়ী
যাওয়ার টিকিট কাটতে পারে না আর সে দ্যাখে মাথা থেকে কোনও শ্বাস বেরোচ্ছে না আর...
ইয়েস
ইয়ে মানে
কবিতা লিখি বলে
নাহ , অ্যাকচুয়ালি
তোমার খুনটা প্লুরাল নয় সিঙ্গুলার তাই
যেমন ?
যেমন মাথা থেকে কোনও শ্বাস
বেরোচ্ছে না আর । অস্ত যেহেতু তুমি কবিতা লিখতে চেয়েছ, মানে ওটা ঢুকে গেছে তোমার
মধ্যে কোনোদিন kono ঠিকঠাক ভাবে আর তুমি
যে অর্গানটা প্রথমেই মেরে ফেলেছ । সেটা তোমার মস্তিষ্ক , ইউ নো যেভাবে হেলে তার
হাত দুটোকে , পিওন তার পা দুটোকে, ঘুড়ি তৈরির কারিগর তার ওড়া টাকে ...
হুম...
তো এইভাবে প্রথমে তুমি মাথা ,
তারপর ঘাড় তারপর পাকস্থলি ও লিঙ্গ মেরে ফেলেছ...
সেক্সুয়ালিটি
!!
হা হা ...
হ্যাঁ লাস্ট নয় কিন্তু , মানে কি জানো , মানে তোমার সেক্সুয়ালিটিই নেই বা ছিল না ,
মানে আমি কি ঠিক তোমাকে বোঝাতে পারছি ?
মোনালিসা
স্মিথ ... অ্যান অ্যামি...
টেড তুমি
এদেরই তো মেরে ফেলতে, মেরে ফেলার পর চুলে শ্যাম্পু করতে, ঠোঁটে লিপস্টিক , পাউডার
দিয়ে গা মুছিয়ে দিতে দিনের পর দিন । ওদের শরীর গুলো পচতে শুরু করত । আর তুমি সেন্ট
ছড়িয়ে দিতে আরও , আরও ধুয়ে দিতে চুল গলা স্তন , দু আঙুলে শক্ত ভালভা টেনে ঢুকে
যেতে এদের মধ্যে
ইস ইট লাস্ট
অর এ সিম্পল কেস অফ নেক্রফিলিয়া ? সেক্সুয়ালি টি !!
গলা খাঁকারির
একটা শব্দ শোনা যায় রিসিভার টা থেকে ,
ওয়েল, এটাও
ঠিক সেক্সুয়ালিটি নয় , মে বি লাস্ট , উঁহু তাও নয় , এ কাইন্ড অফ মেকিং আর্ট ইয়ু
ক্যান সে , এটা একটা মার্ডার কে আরও চার্মিং করে তোলা ,
অনেকটা যেন ক্রিসমাসট্রির মতো উজ্জ্বল ও সুন্দর করে তোলা
তুমি যেভাবে
শব্দগুলোর ইউস করার চেষ্টা করো কবিতা জুড়ে ।
কিন্তু
শব্দগুলো নয় , কবিতাটা , কবিতা টাই , আর আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে কবিতা ম্যাটার টাই
নেই , সে বহুদিন আগে থেকে মৃত । এখানে মৃত অর্থাৎ
নেই... সংজ্ঞায় , কল্পনায় , ভাবে ও নির্ণয়ে । সো এখানে নেক্রফিলিয়া ইস নট এ ম্যাটার ইয়েট এই যে আমি নিপল গুলো দাঁতে ছিঁড়ে দিতাম ,
নিতম্বের তল বরাবর কামড় চুবিয়ে দিতাম অনেকক্ষণ , এটা ইম্পরট্যান্ট নয়। আমি আমার
লিঙ্গ মেরে ফেলেছিলাম অনেক আগেই। আসলে আমি জানতে চেষ্টা করেছি হয়ত, মেয়েটা কি
মার্ডাড ; সংজ্ঞায় কল্পনায় ভাবে ও নির্ণয়ে।
সে অনেক রাতে
মাঝে মধ্যে শিস দিত আমায় , ফেসবুক থেকে ফোনে উঠে এসে সে জানতে চাইত আজ কতগুলো
সিগারেট খেয়েছি। আর সংখ্যাটা শুনে আঁতকে উঠে অদ্ভুত সুন্দর একটা ইশশশ বসাতো টাকরায়
। আমি শুধু ওই ইশশশ আরো গাঢ় আরো লম্বা শুনবো বলে সিগারেট খাওয়া বাড়িয়ে দিতাম ।
টাওয়ার ধরে খুলে দিতাম তার ব্রা ও প্যান্টি আর বাথরুম পর্যন্ত নিয়ে যেতাম তাকে ,
সে আমাকে তার
হিসির শব্দ শুনিয়েছিল ,
একটা হিসি
একটা বাথরুম আর তার মাঝখানে ধরে রাখা মধ্যরাতের ফোন । হু হু করে উড়ে যেত আমার সব ,
কত কতবার। কত কতবার বউ রাতে খাওয়ার পর বাসন মাজার পুকুরে গেলে আমি গেছি পিছু পিছু
, বউ এর দু পায়ের ফাঁকে হাত চেপে কানের লতি কামড়ে ধরেছি , গরম উষ্ণ ও নোনতা এক
গড়িয়ে যাওয়ায় করতল ভরে গেছে আমার আর আমি কেঁপে উঠেছি সমস্ত কচুরিপানা বাঁশবন ও
ধুয়ে ওঠা বাসনপত্র নিয়ে ।
ওই হু হু করে
উঠে যাওয়াকে তুমি বলবে না কিছু ? ইস ইট এ সিম্পল কেস অফ য়ুরোলাগ্নিয়া ?? টেড !
এ গুলো
ইন্সটান্স , পিওরলি মে বি , কিন্তু একটা কোটিং , তোমার রুটের ওপর লেগে থাকা মাখন
মোম চীজ বা কাদামাটি অ্যাজ য়ু সে ।
বলছ !
ইয়াপ...
প্লিজ প্রোসিড ।
কোনোদিন আমি
তার অ্যানাস এ ঢুকে পড়তে চেয়েছি । প্রবলভাবে চেয়েছি । সমস্ত লুব্রিকেশন ও
স্যালাইভা থেকে । আর সে জানোয়ার বলে এক ঝটকায় সরিয়ে দিয়েছে আমায় । ওখানে নয় বলে
আবার সমান হিস হিসিয়ে টেনে নিয়েছে ভ্যাজাইনার ভেতর , আর সমস্ত দোলানি ধরে রেখে
তারপর আমি শুধু কবিতার লাইন ভেবে গেছি ডিসচার্জ না করা পর্যন্ত ।
ইয়েস দ্যাটস
দ্য পয়েন্ট , রিজেকশান , রিজেকটেড , অস্ত ওটাই একমাত্র ঐ একটি শব্দ তোমাকে তোমার
রুট এ পৌঁছে দেয় । ঐখানে আর কোটিং থাকে না , মাখন সরে যায় কাদামাটি মোম...
তুমি
পরিস্কার চলে যাও তোমার রুটের কাছে।
অদ্ভুত !
একদম , আর
আমি ওই রিজেক শন টা নিতে পারি নি কোনোদিন ।
আই নেভার
রিজেক্টেড ফর সোডোমাইজিং , বিকজ দে আর ডেড অ্যান্ড বিকজ আই মার্ডারড দেম , আমি মেরে ফেলতাম, রুটে চলে যেতাম অস্ত। আর যা কিছু
তুমি দেখলে ঐ মেক আপ ঐ শ্যাম্পু ঐ ডিওড্রেণ্ট, নাথিং নাথিং, হোয়াট ক্যান আই সে - তুমি অ্যালেকজান্ডার পিচুস্কিন
কে চেনো কি?
একটু একটু ,
আই মিন তুমি কি চেস বোর্ড কিলারের কথা বলছ ?
“For me ,
Life without killing is like life without food for you”
এগজ্যাক্টলি , কনকলে নিচ্ছি দাঁড়াও, তুমি আর আমিও বোধহয় সেক্সুয়ালিটি
বা লাস্ট থেকে বেরিয়ে আসতে পারব... বুঝতে পারব আমরা ঠিক বলতে চাইছি...
ইন্টেলেকচুয়ালিটি…!!
হা হা , মে
বি ।
হ্যালো...
পিচুস্কিন
...?
ইয়েস
হিয়ার ইস টেড
, আর আমার সঙ্গে অস্ত আছে , অস্তনির্জন দত্ত ইন অ্যানাদার কল, তোমার কি একটু সময়
হবে সময় দেবার ?
অস্তনির্জন !
হু ইস দিস ?
কবি , কবিতা
লেখে...
মাই গড ,
হোয়াট এ পুওর মাদারফাকার !!!
ওকে ,ওকে , অ্যাকচুয়ালি আমরা মার্ডার বা
কবিতা লেখা নিয়ে কথা বলছিলাম, যে হোয়াট ইস দ্য রিয়েল রুট ! অ্যান্ড ইফ রুট
পারসিস্টস , দেন রুট ইস ডেড মানে নেই মানে ছিল না মানে আমি বোঝাতে চেষ্টা করছিলাম
হুএভার য়্যু আর , এ মার্ডারার অর এ পোয়েট অর এ ড্রাফ্টসম্যান , তোমার সব কাজ
হাগা মোতা খাওয়া থুতু ফেলা চাকরিবাকরি এভরিথিং ইস এ কোট , অ্যান্ড হোয়েনএভার তুমি রিজেক্ট হচ্ছো তুমি ঢুকে যাচ্ছ তোমার রুট পয়েন্ট এ, আর
এই রুট পয়েন্ট টাও বেসিক্যালি এক্সিস্ট
করে না ...নেই... মানে মানে...
স্টপ , স্টপ, হোয়াট এ ফিলসফি !! টেড এ মার্ডার ইস এ মার্ডার, তার জন্য রুট , কোটিং ,
সেক্সুয়ালিটি হোয়াট ইস দিস ? শোনো আমার হাতে সময় কম , বাট
দ্য ফ্যাক্ট ইস -
তোমার বাঁচার জায়গাটা , তুমি যদি
জেনে থাকো সেটা , সেটাই তোমার মেন কার্স , অভিশাপ , আর কিছু না –
সেখানে আর্ট সেক্সুয়ালিটি, ওয়ার্ড , পোয়েম ,মার্ডার ইস অল অ্যালাইক । আমি জাস্ট
জেনেছিলাম আমাকে মারতে হবে , আমার হাতে কোন ভাব বা আর্ট ছিল না , প্রস্তুতি ছিল ,
যেটাকে তোমরা ঐ আর্ট বা ভাব বলে সেন্স দিচ্ছ । তোমাদের তথাকথিত সেক্স ফেক্স এর মতো
ছেঁদো ব্যাপারও ছিল না । আমি জাস্ট ভদকা খাইয়ে মানুষটাকে ভোঁ ভোঁ করে দিতাম আর তার
পিছনে গিয়ে মাথায় এক হ্যামারের ঘা। ফট করে খুলিটা ফেটে যেত , aha একটা অপূর্ব শব্দ
, আর ঐ ফাটলে আমি চুপচাপ ভদকার বোতল টা ঢুকিয়ে দিতাম । দ্যাটস অল...
তার জন্যে আমার কোন অনুতাপ নেই ,
কোন খেদ নেই আমি জেনেছিলাম আমি কি চাই , আমি গর্বের সঙ্গে সেটা করে গেছি এই সব
আর্টের ফাঁক, করুণা পেতে চাওয়া, সেক্স ফেক্স, আমার প্রতি অবিচার করা হল, আমাকে কেউ
বুঝল না ! এসব মাদারচোদদের ভাবনা, অ্যাম আই ক্লিয়ার, গুড নাইট ।
দিল্লীতে আমার খুব একটা প্রিয়
জায়গা আছে তুঘলকাবাদ ফোর্ট , অনেকটা খালি আর ভাঙা আর হাওয়া , উড়ে যাওয়া পাথর , কিয়স্ক
, রুক্ষ লালচে চুপ আবার রুক্ষ । আমি মাঝে মাঝে সেখানে গিয়ে চুপ করে বসে থাকি ।
সিগারেট খাই , মিনারেল বোতলের ভেতর ভদকায় চুমুক দি । সন্ধ্যার ঠিক আগে গার্ড এসে
ডাকে “টাইম ওভার ”।উঠে আসার আগে ..
আমি আরো একবার ঝুঁকে যাই ,নেই নেই
নেই, পাথর ছুঁড়ি নিচের দিকে আর একটা কয়েনের শব্দ হয় ! তলায় তাকিয়ে দেখি অর্ধেক
শূন্য থেকে ঝরছে অঝোর জল আর একটা হালকা মোরামের অন্ধকার, তার ভেতর দিয়ে চিতিকাঁকড়া
গুলো শামুকের মাংস দাঁড়া দিয়ে চিপে কামড়ে উঠে আসছে চুপচাপ জেদি অভিযোগহীন ...
অমিতাভ মৈত্রর জন্ম ১৯৫২ সালে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ বিদ্ধ করো, তীর প্রকাশিত হয় ১৯৮৬ সালে। তাঁর অন্য কবিতার বইগুলি হোলো পতনকথা, টোটেমভোজ, ষাঁড় ও সূর্যাস্ত আর পিয়ানোর সামনে বিকেল। গদ্যগ্রন্থ দুটি। পতনশীল নায়ক আর সাপলুডো। অন্যরকম মানুষ। পরিচিতজনেরা জানেন। অন্যরকম পাঠক জানেন।
যুদ্ধক্ষেত্রে বেদনার্ত আলো-বহনকারী
অমিতাভ মৈত্র
আপেল
আপেলের মধ্যে থাকে শুধু আর একটি আপেল অথবা তার সম্ভাবনা
যেমন নারী;
আর তার বেড়ে ওঠা কেবল পূর্ণতার
দিকে
যেমন মৃত্যু;
আর তার শরীরে এমন এক আদিম
সরলতা
যার সামনে ঘাতকের অস্ত্র থমকে
দাঁড়ায়।
আবার আপেলের যা নেই, খুব
সাধারণভাবে আমরা তাকে
বোধ বলতে পারি,
আর যার বোধ নেই তার কোন জাগরণও নেই।
হয়ত তাই একটা সুতো আঁকড়ে মুখ
বুজে ঝুলে থাকা
খুব স্বাভাবিক লাগে তার। আসলে
আপেলের
নেই শুধু কোন অসুখ, কোন
পরীক্ষামূলক যুদ্ধের প্রস্তুতি।
শিকার কাহিনি
রাত দেড়টায় আমরা চাঁদের শিকার
দেখতে বাগানে নেমেছি,
বন্য চিতার মতো গুঁড়ি মেরে
চাঁদ এসে লাফিয়ে পড়েছে
মেঘের নরম ঘাড়ে--
এ দৃশ্য দেখেনি কেউ, শুধু কিছু
রাত্রিভুক পাখি
অতর্কিতে ভয় পেয়ে ডেকে উঠেছিল
পুলিশ লাইনে টানা বেজে উঠেছিল
বাঁশি, আর
রাত্রিকে নস্যাৎ করে দৌড়ে
গিয়েছিল দমকল।
দৃশ্যটির ফ্রেম ভেঙে যেতে
আমরা বিরক্ত হয়ে ঘরে ফিরে
ঘুমিয়ে পড়েছি।
দাঙ্গার খবর শুনি পরদিন
রেডিওয়, স্থানীয় সংবাদে
যতক্ষণ টগর থাকবে
মেয়েটিকে হিঁচড়ে টেনে নিয়ে
যাওয়া হচ্ছে মিলিটারি ব্যারাকে
নাচের জন্য। ভিতরে মাংসের
গন্ধ, আগুন
আর জড়ানো গলার হৈ হল্লা।
নতুন দখল হওয়া এই শহরে
কোথাও আলো জ্বলছে না আজ।
ধোঁয়া উঠছে এখানে সেখানে—
একটানা বেজে যাচ্ছে বলির
বাজনা।
অভ্রকণার মতো চাঁদের আলো আছড়ে
পড়ছে
রক্তের হালকা ছোপ লাগা একপাটি জুতোয়
ভয়াবহভাবে কোথাও ফুটে উঠেছে
টগর।
যতক্ষণ চাঁদের আলো থাকবে, টগর থাকবে
ততক্ষণ মেয়েটি হয়ত নিরাপদ।
কিন্তু তারপর?
সামান্য শব্দজীবি, এর বেশি
জানাবোঝা নেই।
কালো ওই মেয়েটিকে ঈশ্বর নিজের
হাত আজ
অনুচ্ছিষ্ট মাংস খাওয়াবেন।
ক্ষুধা
শাক্যসিংহ বিষয়ক আমাদের গল্পের
ভিতরে
ভেসে ওঠে ফাঁপা, গোল চাঁদ—আর
আমাদের ছোটবোন গলা মোচড়ানো সাদা
হাঁস
কাপড়ে আড়াল করে ভেজানো দরজা
খুলে
ভোর রাতে বাড়ি ফিরে আসে
ক্ষুধাকে সে বোধিজ্ঞান ভাবে
না এখন।
ত্রিশ-বত্রিশ বছর আগে যে
কবিতা লিখতাম তা ছিল এইরকম। বছর দশেক ধরে লেখা এইসব কবিতা নিয়ে বেরিয়েছিল আমার
প্রথম বই ‘বিদ্ধ করো, তীর’। দু-ফর্মার সেই রোগা বইটাতে যত বেশি সম্ভব কবিতা রাখার
চেষ্টা করেছিলাম। তখনই আমার মনে হয়েছিল—দীর্ঘদিন ধরে এমন কবিতা লিখে যাওয়া—আমি
পারব না। আরও প্রত্যক্ষ আরও কর্কশ ও তীব্র কিছুর জন্য প্রতীক্ষা করছিলাম তখন।
এমনকি যদি তা যোজন দূরত্বে চলে যায় শিল্প থেকে কবিতা থেকে—যায় আসে না কিছু।
চাইছিলাম শিল্পিত প্রকাশভঙ্গি থেকে বেরিয়ে আসতে। যদি নরম গোলগোল এইরকম সব কবিতা
আমাকে দীর্ঘদিন ধরে লিখে যেতে হয় এই সামান্য পুঁজিপাটা সম্বল করে—বজরা ঠেলা লগি
দিয়েও সেই কবিতা স্পর্শ করবেন না কেউ। প্রবল শক্তিমান যাঁরা তাঁদের কথা আলাদা।
তাঁরা যা পারবেন আমি তো তা পারব না। তাহলে কি আমাকে সারাজীবন এইরকম কবিতাই লিখে
যেতে হবে?
‘বিদ্ধ করো, তীর’-এর এইসব
কবিতা থেকে আমার আত্মা বিযুক্ত হয়ে গেল। নিজের কবিতা বিষয়ে স্ফীত আস্থা নেই এমন
মানুষ যা করতে পারেন, আমি তাই করলাম। এরিনা ছেড়ে সরে গেলাম।
২।
ফিরে এলাম দশ বছর পরে, রাত্রির
যুদ্ধক্ষেত্রে বেদনার্ত আলো- বহনকারীর মতো। যে পৃথিবী আমার ছিল এতদিন, তা ভাঙতে
শুরু করল আস্তে আস্তে। এক জান্তব আক্রোশ তৈরি হত। আমি নিজের দিকে ঘুরিয়ে দিলাম সেই
আক্রোশের অভিমুখ। যে বিষবাস্পে পরিপূর্ণ অন্ধকার ঘরগুলি আমার দেখার কথা, কিন্তু
অসহনীয় বলে যে ঘরগুলি আমি এড়িয়ে গেছি এতদিন, আমি আশ্রয় খুঁজে পেলাম সেখানে। দেখতে
চাইলাম ডিসভর্তি থকথকে রক্তমাখা ঠোঁটগুলোর দিকে তাকিয়ে ‘আলো’ শব্দটি উচ্চারণ
করে সত্যি আমি আলো সৃষ্টি করতে পারি কিনা। নিজের জন্য এই ছিল আমার চপেটাঘাত।
চেয়েছিলাম আক্রোশের অভিমুখ আমার
দিকে ঘোরাতে। কিন্তু সেই আক্রোশ নিজেই জীবন্ত হয়ে উঠে প্রতিশোধ নিতে শুরু করল আমার
উপর। এমন এক ভয়ংকর দেখায় জীবন নিয়ে গেল আমাকে যে, প্রতিরোধহীন ভেসে গেলাম আমি।
বুঝলাম যে জীবন আমরা যাপন করি আসলে তা ইলিউশান, যেটা সরিয়ে নিলে দর্পণহীনভাবে
মেড়ুসার চোখে চোখ রাখতে হয় এবং ফেরা যায় না আর। রাতের পর রাত আমি ঘুরে বেড়িয়েছি
প্রেত-তাড়িত সেই প্রাচীন নাবিকের মতো একা। রক্তপাতের দৃশ্য সহ্য করতে
পারতাম না একদিন। পরে রক্তস্রোতেই নৌকা ভাসতে লাগল আমার। সেই বিভীষিকার জগৎ রক্তের
আঁশটে ব্লান্ট-গন্ধ মাখা ভাষায় উঠে এল ‘টোটেম’...-এ। বইটাকে কবিতার বই বলতে হলে
দু-বার ঢোঁক গিলতে হবে আমাকে।
এবার আমার মতো করে লিখতে
শুরু করলাম। তার আগে সর্বস্বান্ত করে নিলাম নিজেকে। যে ধরনের দেখায়, যে ধরনের
প্রকাশভঙ্গিতে সহজ ছিলাম, বর্জন করলাম সে-সব। ঠিক করলাম vision of evil থেকে যা উঠে আসে না, তা আমার
কবিতা নয়। ভাষাকে করে তুললাম আড়ষ্ট, মন্থর, শ্বাসরোধকারী। প্রচুর ক্রিয়াপদ চলে এল।
সংকেতময়তা থেকে মুক্তি দিলাম আমার ভাষাকে। ‘টোটেম’...এর পরে যখন ‘সি. আর. পি. সি ভাষ্য’ বা Tarot
card নিয়ে লিখতে শুরু করলাম তখন মনে হল ভাষার সঙ্গে এই অসমযুদ্ধ
এবার শেষ হওয়া দরকার। নাহলে এই ভাষা আমাকেই খেয়ে ফেলবে। ‘টোটেম’... লেখার সময়
একধরণের অ্যাংজাইটি নিউরোসিস চেপে বসেছিল আমার উপর। ‘অদ্ভুত সব চোখ, আর এক গোল
মাংসমাখা ভাষা’ আমাকে অস্থির করে দিত।
খুব বোকার মতোই আমি চেয়েছি
একটা project work-এর মতো
করে লেখা তৈরি করতে। ‘টোটেম...’—এ ছিল একটা সিউডো এপিকের আদল। ম্যাডাম এম. ছিল যার প্রোটাগনিস্ট এবং মাংসের বিরুদ্ধে যুদ্ধই যেখানে প্রধান। ‘ষাঁড় ও
সূর্যাস্ত’ বইটিতে আমি বস্তু, আলো গতি নিয়ে ছোটছোট ভাবনা লিখে রাখার চেষ্টা
করেছিলাম মেটাফিজিক্যাল ধরনে। ওইসব বিষয়ে আমার জানার পরিধি এত কম যে কবিতাগুলো
খানিকটা জটিল আর স্মোকি হয়ে গেছিল। মাংস থেকে পরিত্রাণ পেতেই কবিতাগুলো লেখা।
কিন্তু লেখাগুলো নিয়ে আমার সংশয় আছে।
দৃশ্য থেকেই আমার লেখা আসে।
দৃশ্য হয়েই আসে। ছায়ায় ঢাকা একটা বারান্দায় একটু আলো নামছে—এই সামান্য দৃশ্যটুকু
থেকে ‘ছায়া’ কবিতাটা লিখেছিলাম যা ‘ষাঁড় ও সূর্যাস্তে’ আছে। ওই বইটিতেই আর একটি
কবিতা ‘মোড় ও বৃষ্টি গাছ’। একটু বিস্তারেই লেখাটা নিয়ে যদি বলি? টেলিভিশানের একদম
প্রথম যুগ। ভারত ওয়েস্ট-ইন্ডিজের টেস্ট দেখানো হচ্ছে দূরদর্শনে। হোল্ডিং-এর একটা
তীব্র গতির বলে অসাধারণ একটা স্কোয়ার কাট করলেন গাভাসকার। অ্যাকশন রিপ্লে তখনও
আজকের দিনের মতো খুঁতহীন হয়ে ওঠেনি। উল্টোদিক থেকে দৃশ্যটি দেখানো শুরু হল। সীমানা
থেকে দ্রুত বলটি ছুটে আসছে গাভাসকারের ব্যাটে। শূন্য থেকে ব্যাট নেমে আসছে,
স্ট্যান্সের ভঙ্গিতে পিছিয়ে যাচ্ছেন গাভাসকার। এবার বল ডেলিভারি ও ফলো থ্রু থেকে
ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছেন হোল্ডিং তাঁর রান-আপ শুরুর জায়গায়। গোটা ব্যাপারটা ঘটল
রিওয়াইন্ড করে দেখার বিভ্রম থেকে। বছর কুড়ি পার বিকেল চারটেয় আমার বাড়ির সামনের
মোড়ে দাঁড়িয়ে। সামনে ওষুধের দোকান। হঠাৎ সেই খেলার দৃশ্যটি মনে পড়ল। ওষুধের দোকানে
হাসতে হাসতে ঢুকে পড়া মহিলাটিকে যদি সেই অ্যাকশান রিপ্লের মতো শেষ থেকে শুরুর দিকে
পিছোতে দেখা যায় কেমন হয়? এবার দেখা যাক কবিতাটি।
মোড় আর বৃষ্টিগাছ
ওষুধের বাক্স থেকে একজন মহিলা
হাসতে হাসতে পিছিয়ে যাচ্ছেন,আর রং—
ক্রিম একটা রেনকোট হাসতে হাসতে
পিছিয়ে যাচ্ছে খটখটে রোদ্দুরে,আর রং—
অর্দ্ধেক গলে যাওয়া বাস চাকায়
একজনকে দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছে
আর হাসতে হাসতে রং—
শেষের দিকে যে গলা তীব্র হয়ে ওঠে
আর দূরত্ব সরে যায়
আর একইরকম হাসতে
হাসতে রং—
দু’বছর ধরে। প্রতি রবিবার।
বিকেল সাড়ে চারটে। দু’বছর ধরে।
৩।
কয়েক বছর পরে যখন ‘পিয়ানোর
সামনে বিকেল’-এর কবিতাগুলো লিখছি তখন ‘ত্রিস্টোফার’ নামের একটা চরিত্র চলে এল।
(যেমন এখন যে কবিতাগুলো লিখছি সেখানে ‘হেনরি’ এসেছে) কবিতায় নাম আসে। কখনও সে নাম
মানুষের। কখনও না-মানুষের। কবিতাগুলি তাদের জন্যই লেখা হয়। আমি চেয়েছিলাম নাম
অতিক্রম করে তাদের চরিত্র করে তুলতে। নানা অবস্থার মধ্য দিয়ে চরিত্রগুলি কখনও
এগোচ্ছে, পিছিয়ে যাচ্ছে কখনও, দাঁড়িয়ে থাকছে। ঘটনার বিবরণ কবিতায় থাকে না সাধারণত।
কিন্তু আমার এইসব লেখায় ঘটনার বা গল্পের একটা আদল আছে। কবিতায় বিশ্বাসযোগ্যতার কোন
জায়গা নেই। কিন্তু এই লেখাগুলোকে আমি নিজেই কবিতা বলে মনে করি না, তাই এই
বিশ্বাসযোগ্যতা আনার চেষ্টা, যাতে পাঠকের (যদি আদৌ কেউ এগুলো পড়েন) সঙ্গে এভাবে
একটা কমিউনিকেশন গড়ে তোলা যায়। নামগুলো/ চরিত্রগুলো আসলে আমার হাত- আমার চোখ, যা
দিয়ে আমি পাঠককে ছোঁয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি।
কবিতা লেখার সঙ্গে প্রতিমা
গড়ার কোথাও একটা মিল আছে। (যেকোন শিল্পের ক্ষেত্রেই কথাটা খাটে।) যখন পৃথিবী
স্তব্ধ হয়ে আসে, আলো হারিয়ে যায় বৃষনক্ষত্র জ্বলজ্বল করে অনন্ত আকাশে—তখন সম্পূর্ণ
একা হয়ে যাওয়া একজন মানুষ ছোট্ট আলো জ্বেলে ঝুঁকে পড়ে এক টুকরো কাগজের উপর। ঠিক
তখনই হয়ত কোথাও আরেকজন মানুষ ছোট্ট আলো জ্বেলে তারই তৈরি করা প্রতিমার মুখে তুলির
শেষ টান দেবার আগে চুপ করে বসে আছে। এই স্থির মুখ, এই আত্মমগ্ন বসে থাকাটুকুই একজন
কবির নিয়তি আর অর্জন।





