রিজিও ইয়োহানান
রাজ:
প্রণয়ের পরিচিত ভাষ্যগুলি অন্য
একটি বিস্তৃতির দিকে এগিয়ে যায় রিজিও
ইয়োহানান রাজের কবিতায়। শরীরী সংকেত, সরল কুহক এসবকিছুর ভেতরেই আত্মদহন আর অবগাহনের পর্বগুলি নির্মাণ করেন তিনি।
মালয়ালাম এবং ইংরাজি এই দুটি ভাষাতেই লেখেন রিজিও ইয়োহানান রাজ। ‘ইউনাক’, ‘নেকেড বাই দা সবরমতী এন্ড আদার গুনা পোয়েমস’ তাঁর পরিচিত কাব্যগ্রন্থ। তাঁর ‘অভিনাশম’ এবং ‘য়াত্রিকম’ উপন্যাসদুটি অনূদিত হয়েছে বেশ কয়েকটি ভাষায়। এন কুমারন আসান,উদয় নারায়ন সিংহ প্রমুখর কবিতার অনুবাদ করেছেন রিজিও।
তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়েছে,কে
সচ্চিদানন্দনের কাব্যসমগ্র।
রিজিও ইয়োহানান রাজ- এর
কবিতা
ইরোটিকা -১
ছেলেটি বললঃ
চলো, আদর করি
আজ রাতে খুব বৃষ্টি হচ্ছে
আর বাতাসও ঘিরে ধরেছে আমাকে
আজ রাতে, তোমাকে একটি রেড ওয়াইনের গ্লাস মনে হচ্ছে
আমার মুখের ভেতর কেঁপে উঠছ
বারবার
(তোমার বাঁ বুকের ঐ নীলচে-
কালো তিলটা
কাঁপতে কাঁপতে তোমার আকাঙ্খার
চিহ্ন হয়ে উঠছে।)
আজ রাতে তুমি একটি মাতাল
সমুদ্র হয়ে উঠেছ
আর উন্মাদের মত গিলে ফেলছ আমার
নৌকোগুলি
(তোমার চুলের তীব্র জরদ, বিদ্যুতের মত
ফুঁড়ে দিচ্ছে আমার কোমরের
মাংস)
আজ রাতে তুমি একটি মৃদু আলোর
ঘর,
যেখানে একটি ছায়া অন্য একটি
ছায়াকে জড়িয়ে ধরছে
(আর অন্তহীন কামনায় ভেসে
যাচ্ছে
আমার ধৈর্যের যাবতীয় চুরুট)
তাড়াতাড়ি কর।
ইরোটিকা -২
১. লাইট হাউস
মেয়েটি বললঃ
আমার স্বপ্নের ভেতর
এখনও রাত্রি নেমে আসেনি
অথচ তুমি একটি লাল রঙের লাইট
হাউস হয়ে গেছ
তুমি
কখনও অন্ধকার সমুদ্রে
তুফান ডেকে আনতে পারোনা
অথচ তোমার শরীর
গেঁথে নেয়
অন্তহীন আকাশের
নীল, ছেঁড়া টুকরোগুলিকে
পাখির বাচ্চারা
তোমার মাথার ওপর বসে
ঝিমোয় আর শিস দিতে থাকে
রামধনুর রঙ, থমকে দাঁড়ায়
তোমার জানালাগুলির ওপর।
একটি একঘেয়ে গানের ভেতর ভাসতে
ভাসতে
দুপুরের বাতাসের বিরক্তি আঁকড়ে
ধরে
তুমি আমার জন্য
আমার উথলে ওঠা সাদা পালের জন্য
দিগন্তরেখার দিকে তাকিয়ে থাকো
আমি তোমার ছায়াটির কথা ভাবি
দীর্ঘ,
কাঁপতে কাঁপতে
একা পড়ে আছে গরম বালির ওপর।
২. দাবানল
মেয়েটি বললঃ
যখন তোমার বন জঙ্গল পুড়ে
যাচ্ছিল
তুমি আমার কাছে দৌড়ে এসেছিলে
পোড়া মাংসের ধোঁয়া আর
মশলার গন্ধ জড়িয়ে
আমি তোমাকে দ্রুত গিলে
ফেলেছিলাম
আর জ্বলে গিয়েছিল আমার
পাকস্থলী।
৩. মদ
মেয়েটি বললঃ
আমি পাগলের মত
তোমার রসালো আঙ্গুরগুলো
চটকাচ্ছিলাম
যতক্ষণ না
ফেনার উল্লাস
আর মদের ঘ্রাণ উঠে আসে।
তোমার ঝুলতে থাকা
আঙ্গুরের থোকার নীচে আমি হাঁটু
মুড়ে বসলাম
আমার হাঁ মুখের ভেতর দিয়ে
চুইয়ে নেমে এল মদ
আমার হৃদয়ও নেশায় চুর হয়ে গেল।
৪. পর্ব
মেয়েটি বললঃ
একটি সাদা খরগোশের মত
তুমি আমার কাঁচা উপত্যকা তছনছ
করে দিয়েছিলে
মৃদু শীৎকার ঢেকে দিচ্ছিল আমার
সবুজগুলিকে যখন
তোমার চোখদুটো তাদের লুকোনোর
জায়গা খুঁজে নিচ্ছিল।
একটি বুনো কাঠবেড়ালির মত
আমার ডালপালাগুলো ঘেঁটে
দেখছিলে
আমার প্রথম আমটি তার সুগন্ধ
উদযাপিত করেছিল
যখন তুমি তাঁর স্বাদু চামড়ায়
নখ বসিয়ে দিয়েছিলে।
একটি কালো ভালুকের মত
তুমি আমার এবড়ো খেবড়ো টিলাগুলো
খুঁজে বেড়াচ্ছিলে
মাটি ঝরে পড়ছিল তোমার কালো
শরীরের নীচে
যখন তুমি আমার ঢালে বিশ্রাম
নিচ্ছিলে।
একটি ছোট বাঘের মত
তুমি আমার অযত্নে বেড়ে ওঠা
ঝোপঝাড়ের ভেতর খেলছিলে
আমার শক্ত মাটি বারবার কেঁপে
উঠছিল
যখন তুমি একটি ফড়িংকে তাড়া
করছিলে।
একটি তৃষ্ণার্ত সিংহ-এর মত
তুমি আমার রোদে পোড়া মাটির ওপর
দিয়ে ছুটছিলে
তোমার কাঁধের আগুন আমার দীর্ঘ
ঘাসগুলিকে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল
যখন তুমি আমার ঝর্নার মুখটা
খুঁজে বেড়াচ্ছিলে।
একটি সাদা বুকের মাছরাঙার মত
তুমি আমার হ্রদের ওপর ঝাঁপিয়ে
পড়লে
গভীরে। আরও গভীরে ঢুকে গেল
নীল ডানা,সবকিছু।
লাফিয়ে নেমে এল আমার জলধারা।
৫. মেয়েটি যা বলেছিল
মেয়েটি বললঃ
তুমি আমার দিকে দৌড়ে আসছিলে
তবু আমি তোমাকে দেখতে পেলাম
না।
তুমি আমার খুব কাছে চলে এলে
তবু আমি তোমার গন্ধও পেলাম না।
তুমি আমার কানে ফিসফিস করে
কিছু বললে
আমি তোমার একটি কথাও শুনতে
পেলাম না।
তুমি আমায় চুমু খেলে
আমি তোমার জিভের স্বাদ পেলাম
না।
তুমি আমার ভেতরে ঢুকে পড়লে
তবু তোমার কোন স্পর্শ পেলাম না
আমি।
অথচ সারাক্ষন ধরে ভালোবাসার মত
কি একটি
জেগে থাকল আমার শরীরে
অন্ধ
অসাড়
বধির
স্বাদহীন
মূক,
যা কিছু আমি ভালবাসি।
৬. গান্ধর্ব
মেয়েটি বললঃ
তুমিই শব্দ,গান
দেবতারা তোমাকে আক্রোশে
স্বর্গ থেকে ছুঁড়ে ফেলে
দিয়েছে।
তোমার গান তোমার সাথেই আছে
খুব ভোরে
যখন বৃষ্টি হয়
আমি জেগে যাই
একটুকরো অন্ধকার আকাশের জন্য
ছটফট করি।
৭ কণ্ঠস্বর
মেয়েটি বললঃ
তোমার কণ্ঠস্বর তোমার আর্তি
বয়ে বেড়াচ্ছে
অথচ আমি তোমাকে কিছু বলতে গিয়ে
থেমে যাচ্ছি বারবার।
৮. ঋতু
মেয়েটি বললঃ
তুমি আমার ওপর উঠে এলে
আমার শরীরে ঝলমল করে উঠল
পাতা, কুঁড়ি
আর ফুলের উৎসব
আমি তোমাকে আমার বসন্তকাল ভেবে
নিলাম।
তোমার গাঢ় আদরে
আমার পাপড়িগুলি
পুড়ে যাচ্ছিল
তবু ফলের ভারে ঝুঁকে পড়ে,
আমি তোমায় গ্রীষ্ম বলে ডাকলাম।
আমাকে জড়িয়ে ধরলে তুমি-
তোমার কাঁধের ওপর
একটি কাঠবেড়ালি
তোমার মাথার ওপর
একটি নীল পাখি
আমার পাতাগুলি শিউরে উঠল
লজ্জায়
ঠিক যেন তুমিই আমার শরৎকাল।
তুমি আমার সবকিছু গ্রাস করে
নিলে
আর একটুকরো বরফ আমার ধ্মনীতে
ঢুকিয়ে দিলে
কুঁকড়ে যাওয়া একটি হৃদয় নিয়ে
আমি আর ভাবতেও পারলাম না-
‘আমার শীতকাল কি চলে এসেছে?’
তুমি কি কোনদিন আমাকে বলবে না,
কোন ঋতু তুমি?
৯. যা কিছু আমি জানি
মেয়েটি বললঃ
আমাকে জিজ্ঞেস কোরোনা
এই প্রেম নিয়ে
আমি কিছু বলতে পারব না।
শুধু যেটুকু আমি জানিঃ
যখন তুমি আমার কাছে থাকো,
তোমার নিঃশ্বাসের ভেতর আমি
ছোটবেলার বুড়ো তেঁতুলগাছটির
গন্ধ পাই ।
তোমার চোখের ভেতর সবুজ আকাশের
ছায়া,
ঐ রকম টিয়াপাখির ঝাঁকের মত
সবুজ
ধান কাটার সময় যারা ক্ষেতের
ওপর নেমে আসত।
তোমার গলার অস্ফুট স্বর
একটি দীর্ঘ গুডফ্রাইডের
মোমবাতির মত
আমাকে জাগিয়ে রাখে।
আর যতবার তুমি আমাকে চুমু খাও
তোমার স্বাদু ঠোঁটদুটো আমাকে
হারিয়ে যাওয়া আমগুলির দিকে
নিয়ে যায়।
আমি ঐ অতীতকে ভুলে যেতে পারি
না।
পাশ ফিরি
তোমার দিকে তাকাই।
১০. শেষ মাথাটি
মেয়েটি বললঃ
এটা দশনম্বরঃ
এটাই তোমার শেষ মাথা।
আমি জানি, তোমার আরও অনেকগুলো মাথার দরকার
আমাকে দেখার জন্য,আমার কথা শুনতে,আমার ঘ্রাণ নিতে,চুমু খেতে
কিন্তু আমার এতকিছু, কিভাবে সামলাবে তুমি?
কুড়িটা হাত দিয়ে তুমি আমাকে
জাপ্টে ধরে রাখতেই পারো
কিন্তু ভাবো, আমাকে ভালোবাসার জন্য
তোমার কাছে শুধুমাত্র একটি
হৃদয়ই আছে।
নাহ্ ! দশটি মাথাই তোমার জন্য
যথেষ্ট।
ভাষান্তরঃ শৌভিক দে সরকার
রঞ্জিত হসকোটে :
সত্ত্বার
খণ্ডবৈচিত্র,অস্তিত্বের অপরূপ বিস্তৃতি নিয়ে এক আশ্চর্য ভ্রমণরেখার সন্ধান দেন
রঞ্জিত হসকোটে ।দেশান্তরী মানুষ, ছিন্নমূল দোভাষী, ব্যর্থ হিপনোটিস্ট,অন্ধ
প্রেমিকরা তাদের ভঙ্গুর অস্তিত্ব নিয়ে উঠে আসে তাঁর কবিতায়। বারবার পাল্টে যায়
অনন্ত জীবন আর ক্ষণস্থায়ী জীবনের বিভাজনরেখাটি । ১৯৬৯ সালে মুম্বাই-এ জন্মগ্রহণ
করেন রঞ্জিত হসকোটে। প্রাতিষ্ঠানিক
শিক্ষাজীবন মুম্বাইতে।‘জোনস অফ অ্যাসল্ট’,‘দা
কার্টোগ্রাফারস অ্যাপ্রেন্টিস’,‘দা স্লিপওয়াকারস আরকাইভ’ তাঁর উল্লেখযোগ্য
কাব্যগ্রন্থ। ১৪ শতকের কাশ্মিরি কবি লাল দেদের কবিতার ইংরাজি অনুবাদ করেছেন তিনি।‘ভ্যানিশিং
অ্যাক্ট’ কাব্যগ্রন্থটির জন্য ২০০৪ সালে
সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
রঞ্জিত হসকোটের কবিতা
সোনালী অরিওল
সূর্যাস্তের আগুনে পুড়ে যাচ্ছিল জানালা
কিন্তু মেয়েটি কোন কিছুই দেখছিল না,
খাটের ওপর ভেসে বেড়াচ্ছিল শুধু
আর একজন হিপনোটিস্ট দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
ওর স্বপ্নগুলো ধরার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল
রাতে চোখ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ভয়ে কাঁপছিল মেয়েটিঃ
ওর চোখের পাতাগুলো কি পুড়ে যাবে? দৃশ্যগুলো মুছে যাবে?
একজোড়া সোনালী অরিওলের মত ওর চোখদুটোও কি উড়ে যাবে?
শেষ পর্যন্ত ঐ হিপনোটিস্টও ঘুমিয়ে পড়ল
ভেসে বেড়াচ্ছিল মেয়েটি, ঐ ছোট ঘরটা আটকাতে পারল না ওকে
মেয়েটি স্বপ্ন দেখল,হাওয়ার ভেতর, নগ্ন উড়ে বেড়াচ্ছে সে
এমনকি ঐ পোশাকটা, যেটা ও নিজে,সেটাও বাঁধা দিচ্ছে না ওকে।
গম্বুজ
যে ক্যালেন্ডারটিকে বিশ্বাস করা হয়
তার তারিখগুলো কখনও পাল্টায় না।
কিন্তু রোদ আর হাওয়া মাঝে মাঝে
অতীতকে নিয়ে ইয়ার্কি মারে
শান্তির সময়, শব্দরা আইসোটোপের মত
টুকরো হয়ে যেতে থাকে
ফাঁকা উঠোন, খালি দোনলা,
তছনছ হয়ে যাওয়া বাগান আর ভাঙ্গা ছাদের ভেতর
শুধু একটি পাগল, শুকনো ফুলের মালা গলায় ঝুলিয়ে
এইসব দৃশ্যের ভেতর ঢুকে পড়ে।
আর একজন অন্ধ ভিখিরি, যে সবকিছু ভুলে যায়
তার খুলির ভেতর একটি মাকড়সা হেঁটে বেড়াতে থাকে
এক মুহূর্তের জন্য আলাদা হয়ে যায় দুটি প্রতিধ্বনি,
অতীত আর ফিরে আসতে পারে না।
একটি রুখ পাখির ডিমের মত নীল রঙের শিরা,
হাওয়ার ভেতর গম্বুজটি জেগে থাকে
স্বীকার করো,
নিজের পরিচয়ের জন্য কোন অপরাধ থাকে না
অপেক্ষা করো, যতক্ষণ না গিলোটিন নেমে আসছে
ফাঁকা হৃদয় আর দীর্ঘ দীর্ঘ স্তব্ধতার ওপর!
মৃত্যু
স্তব্ধতা খুব সরল হতে পারে, যেমন একটি ছোট জাহাজ
কোন সাইরেন না বাজিয়েই জেটি থেকে উধাও হয়ে যায়
স্তব্ধতা ঐ থালাটির মত
যার গা থেকে ব্যকরণের দাগগুলি তুলে ফেলতে হয় না।
স্তব্ধতা আগুন,
মুক্তি সম্ভাবনাহীন একটি চরম শাস্তির নাম।
স্তব্ধতা আসলে একটি চিতাবাঘ
সবুজ চোখে যে শুধু আমাদের ওপর নজর রাখে।
অ্যালিবাই
বাতাসের শরীর থেকে তোমার আঙুলের দাগগুলো মুছে দাও
যে কাপটিতে তুমি কাল রাতের
শেষ কফিটা খেয়েছিলে, সেটাকে ধুয়ে ফেল।
জানালা দিয়ে যা দেখা যাচ্ছিল
মেঘ,আকাশ,পাহাড় সেসবকিছুই
পর্দাটা দিয়ে আলতো করে মুছে নাও।
ফটোফ্রেম থেকে তোমার ফটোগ্রাফটা ছিঁড়ে নাও।
অনিক্সের কৌটো থেকে লাল চুলের ক্লিপটা উঠিয়ে নাও
আর ডেস্কের ওপর থেকে চশমাটা
তোমার পায়ের ছাপগুলো ঢেকে দাও
আর জলের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে ফিরে যাও
তুমি কোনোদিন আসোই নি এখানে।
দেশান্তরী
চলে যাওয়ার সময় জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল ও
রুপোলী ডানার কোনায়
মেঘের চাদরের ভেতর
একফোঁটা চোখের জল ক্রমশ বড় হচ্ছে।
ওর ভেতর দিয়েই ও দ্যাখে (অথবা ওটাই ভেবে নেয়)
অনেক মাইল নীচে ট্রাফিকের আলোগুলি জ্বলছে
সবুজ আর গাঢ় হ্লুদ রঙের তীরচিহ্ন
বৃষ্টিতে ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে গাড়ির উইন্ডস্ক্রিন
তুবড়ে যাওয়া ট্যাঙ্কের ওপর থেকে লাফিয়ে নামছে সেনারা
পাসপোর্টটা আঁকড়ে ধরে ও
পুরনো নম্বরের জন্য আর কোন জায়গাই ফাঁকা নেই।
চোখের জলের ফোঁটাটিকে ফুঁড়ে দিল মেঘ
আর ও একটি তোয়ালের জন্য ব্যাগটা হাতড়াতে লাগল
কেবিনের ভেতরটা হঠাৎ খুব তেতে উঠছিল
ঠিক যেমন অনেক মাইল নীচে
আগুনে পুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছিল ওর নিজের শহর।
তবিশ খৈর : ভাষা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, ইতিহাস ও সমকাল এক আশ্চর্য
দ্রাব্যতায় একাকার হয়ে যায় এতবিশ খৈরের কবিতায়। অস্তিত্ব, খণ্ড সত্তার
অনুভূতি,ইতিহাসের ব্যবহৃত পৃষ্ঠা এসবকিছুর ভেতর এক মিতবাক, ভ্রমণরেখার সন্ধান
দেন তবিশ তাঁর ইংরাজি কবিতায়। “হোয়্যার প্যারালাল লাইনস মিট’’ এবং “ম্যান অফ গ্লাস” কবিতার বইদুটি ছাড়াও “দা বাস স্টপড’’, “ফিল্মিং’,’থিংস অ্যাবাউট থুগস’’ তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস। ১৯৬৬ সালে বিহারের গয়ায় জন্মগ্রহণ করেন তবিশ।এবং
একজন “স্মল টাউন কসমোপলিটান” হিসেবে গয়াতেই বেড়ে ওঠেন। বর্তমানে ডেনমার্কের আরহাস বিশ্ববিদ্যালয়ে
অধ্যাপনা করেন ।
তবিশ খৈর এর কবিতা
চোখ
(ঠাকুমা)
মৃতরা একদিন বেঁচে ছিল,
আর জীবিতরা এখন মৃত।
ঠাকুমা বলতেনঃ
মৃতরা নাকি আমাদের থেকে ভালো অবস্থায় আছে
ওদের আর ফিরে আসতে হয়না।
আর মরে যাওয়ার পর নাকি অনেক কিছু জানাও যায়।
চোখগুলো অবশ্য মরতে পারে না।
ওর চোখদুটো খুব শান্ত ছিল
ওর চোখদুটো এখন আকাশের তারা হয়ে গিয়েছে।
ওরা ওর চোখের ওপর দুটো কয়েন রেখেছিল
মুখের ওপর কিছুটা মাটি ছড়িয়ে দিয়েছিল আর
মাথার নীচে একটি পাথর রেখে দিয়েছিল
কিন্তু মাটি ওকে রেখে দিতে চায়নি।
পরের বোমটাই গোরস্থানের ওপর আছড়ে পরেছিল।
মৃতরাও আবার ফিরে এসেছিল
মৃতদের অবস্থাও আমাদের থেকে খুব একটা ভালো না।
আমার সন্দেহ হয়
মৃতরাও খুব একটা কিছু
জানে না।
তবে আমি বিশ্বাস করি
চোখগুলো কোনদিন
মরতে পারে না।
যুদ্ধের রিপোর্টার
(বুড়ি গাছ-মা)
লোকটা যাকিছু দ্যাখে, সেটাই স্টোরি হয়ে যায়
যেটা ছোঁয়,সেটা থেকেই একটা ঘটনা বেরিয়ে আসে
ছেলেদের জড়ো করে, খুব ধীরে ধীরে
সারি বাঁধা চায়ের কেটলি থেকে গল্প ঢালতে থাকে লোকটা
কিন্তু ও কি ,ঐ মেয়েটার গল্পটা বলবে
যে দরজায় কড়া নাড়ার শব্দে ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকত?
অথবা ঐ ছেলেটার গল্প
যে শুকনো খটখটে মাটিতে ভিজে অবস্থায় পড়েছিল?
অথবা ঐ বাচ্চাদের গল্পটা
যারা সবসময় শুধু আকাশের ভেতর দিয়ে উড়ে যেত?
লোকটা কি কোনদিন বলবে যে বাচ্চাগুলোর বাবা মায়েরা
হাঁটতে হাঁটতে তোমার বাড়ির দিকেই এগিয়ে এসেছিল?
যান্ত্রিক
(নাইটিংগেল)
এর ডাকটা আদৌ কাঁচের ঘণ্টার মত নয়।
অনেকটা বন্দুকের মত এর আওয়াজ।
এই আশ্চর্য যন্ত্রটাকে বানাতে নিশ্চয়
অনেক মেহনত করতে হয়েছে!
যদি এর ডানা থাকত,তবে এ ঠিক উড়ত।
জিভ থাকলে, কথাও বলতে পারত।
কিন্তু,বারবার ঐ একটি গানই গাইতঃ
আমরা কি ঐ গানটি শুনতে শুনতে বিরক্ত হয়ে যেতাম না?
প্রার্থনা
(থাম্বেলিনা)
আমাকে একটি ছোট বাচ্চা দাও
আমি তাকে লুকিয়ে রাখব
যখন মোল্লারা বাড়িতে নামাজ পড়তে আসবে,
যখন প্লেনগুলি শিকারের পাখি হয়ে যাবে।
যে কোন একজন
আমার বুড়ো আঙুলের থেকে ছোট কেউ
যাকে আমি পকেটে ঢুকিয়ে দৌড়ে পালাব।
(অনুবাদ : শৌভিক দে সরকার)
(অনুবাদ : শৌভিক দে সরকার)

অরবিন্দ কৃষ্ণ মেহরোত্রা : শুধুমাত্র ভারতীয় ইংরেজি কবিতাকে অন্য একটি বিস্তৃতির দিকে নিয়ে যান নি অরবিন্দ কৃষ্ণ মেহরোত্রা, বহুস্বর ও বহুবর্ণে বিন্যস্ত আবহমান ও সমসাময়িক ভারতীয় কবিতাকে বিশ্বপাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন তার অন্তরঙ্গ অনুবাদ্গুলির মধ্যে দিয়ে। ১৯৪৭ সালে লাহোরে জন্মগ্রহণ করেছিলেন অরবিন্দ।নাইন এনক্লোজারস, ডিস্টান্স ইন স্টাটুট মাইলস,মিডল আর্থ, দা ট্রান্সফিগারিং প্লেসেস তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। সম্পাদনা করেছেন দা অক্সফোর্ড ইন্ডিয়ান অ্যান্থলজি অফ টুয়েলভ মডার্ন ইন্ডিয়ান পোয়েটস, অ্যান ইলাস্ট্রেটেড হিস্ট্রি অফ ইন্ডিয়ান লিটারেচার ইন ইংলিশ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলি। কবীর,নিরালা,গজানন মাধব মুক্তিবোধ,বিনোদ কুমার শুক্ল, মংগলেশ ডাবরাল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, আদিল মনসুরি প্রমুখর কবিতা অনুবাদ করেছেন অরবিন্দ কৃষ্ণ মেহরোত্রা।সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর কালেক্টেড পোয়েমস ১৯৬৯-২০১৪ কাব্যগ্রন্থটি।ড্যাম ইউ, এজরা, ফকির প্রভৃতি ম্যাগাজিনগুলি সম্পাদনা করেছেন তিনি।
অরবিন্দ কৃষ্ণ মেহরোত্রার কবিতা
একজন ভালো সুররিয়ালিস্টের গান
১.
হাওয়া একটা কাগজকে ভাঁজ করে দিচ্ছে
আর পালকের মত উড়ে যাচ্ছে দেশগুলো
মাটিতে গড়িয়ে পড়ছে ম্যাপ
খেলনা, গ্লোব আর শেকলগুলো সমুদ্রের ওপর ভাসছে
সবকিছু একদম আকাশের মত দেখাচ্ছে
তটরেখাহীন একটা পৃথিবীতে রঙের লড়াই
কিছুই পাল্টাচ্ছে না
২.
জন্তু জানোয়ারের কথা উঠলেই আমার সমুদ্রের ধারে
মুখ গোমড়া করে বসে থাকা বেড়ালগুলোর কথা মনে হয়
আর সমুদ্রের তলায়
একটা সাবমেরিন ভর্তি ইঁদুর
৩.
একটি কয়েন,সামান্য আগুন, একটি রুমাল
একটি বিন্দু, একটি কাঠের হাতি, একটি পাতা
হাল্কা ঝড়, একটি হিমবাহের রাস্তা, একটি বাটি
আগুনের রং আর গন্ধ একদম লেবুর মত
আর হাতিটি তার শুঁড় দিয়ে বৃষ্টি ডেকে আনছে
হিমবাহটি অন্যপাশে ফিরছে আর মরে যাচ্ছে
চুলের দূরত্বে তারাদের দৈর্ঘ
গুটিয়ে যাওয়া একটি চোখ,অন্যটি পোকার বাড়ি
মাকড়সাদের থেকে বেশি ঝলমল করছে কানগুলো
৪.
পাহাড়, যাযাবর, শান্ত বাচ্চা আর রাজারা
এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে ঘুরছে
তাড়া খেয়ে বেড়াচ্ছে তাঁদের পবিত্র চেহারা
অদ্ভুত অভ্যাস আর সঠিক খুলিগুলোর জন্য
কেউ মৃত, কেউ নদীতে পড়ে আছে
কেউ আবার খুব তাড়াতাড়ি পৃথিবীতে ফিরে আসছে
গুহাগুলিতে এখনো তাঁদের পায়ের ছাপ পড়ে আছে
আর দাঁড়িয়ে থাকার জায়গাটায় একটি কালো হ্রদ
৫.
আমার হাতের রেখাগুলি একটি অ্যাকরিয়ামের মাছ
৬.
যখন দুটো পাথর কিম্বা শুকনো ডাল ঘষা হয়
আগুন জ্বলে ওঠে
আর যখনই কোনও মানুষকে ভুলে যাওয়া হয়
মৃদু একটি কাঁপুনি টের পাওয়া যায়
আকাশ বেলুনে ভরে ওঠে
প্রার্থনা আর মাশরুম
জন্তু জানোয়ার আর ক্লাউনরাই স্বপ্ন ডেকে আনে
৭.
একটি ফেলে যাওয়া ট্রাংকের ভেতর
হাত,পা
আর মাথার টুকরো পড়ে আছে
হাতগুলো একজন মৃত রাজমিস্ত্রির
বাঁ পায়ের পাতাটা একজন জেলপালানো বন্দীর
মাথাটা দিব্যি টেবিলের ওপর বসছে
আর কোন শব্দ করছে না
৮.
মেঘেদের সবসময় বিশ্বাস করা যায় না
একদিন একটি আমার ঘরের ভেতর ঢুকে পরেছিল
আর আলমারির পেছন থেকে ডাকছিল
আমি এই শহরটা ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম
অথচ একটি শিকারি কুকুরের মত
শহরটা আমার গন্ধ খুঁজে বের করেছিল
৯.
ফলের দিকে তাকালেই সেগুলি পেকে যায়
ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই আপেল বাদামি হয়ে যায়
আর দুধের দাঁতগুলি ইচ্ছে চাড়িয়ে দেয়
পতনের সকালবেলাগুলি অনেকটা বিষাক্ত কুয়োর মত
আমি একটি রুপোলী গেট খুলে বাইরে বেড়িয়ে এলাম
পর্দার ওপর একটি সাপের ফনা
আর দেওয়ালের খুব কাছেই আমার বোনের খুনী দাঁড়িয়েছিল
১০.
একটি গোল মুহূর্তকে আমি গিলে ফেলেছিলাম
আর ঘড়িগুলো আমার ভেড়াদের খাইয়ে দিয়েছিলাম
পাখির ডানায় ওদের বেঁধে দিয়েছিলাম
ফায়ারপ্লেসের আগুনে ছুঁড়ে ফেলেছিলাম
গলে যাওয়ার জন্য অ্যাসিডে চুবিয়ে রেখেছিলাম
ডুবে যাওয়ার জন্য জাহাজে উঠিয়ে দিয়েছিলাম ঘড়িগুলোকে
ফুলের গোল মাথাটিকে মাটির নিজস্ব কাজকর্ম
দেখানোর জন্য এসবকিছু করছিলাম শুধু
১১.
গাছেরা তাঁদের অস্ত্রশস্ত্র নামিয়ে রাখছে
আর যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করছে
আর চক্কর কাটতে থাকা কাকটির শরীরে
একটা গোপন পালক বেড়ে উঠছে
ঠিক ওখানেই উপত্যকাটি
অন্য একটি সূর্যের দিকে নিজেকে মেলে দিচ্ছে
ক্রমশ ধূসর হয়ে উঠছে নীল আকাশ
আর মনের মধ্যে একটি বেঁটে পাহাড় গড়িয়ে পড়ছে
প্রথম লাইনগুলির তালিকা
১.
ও আসলে একটি সাপ ,বাতাস, অথবা পাতা
ওর কান্না বারবার দরজায় আছড়ে পড়ছিল
আর আমি ওকে ভেতরে ঢুকতে দিয়েছিলাম
ওর মুখটা একটি কাগজের মত লাগছিল
যেখানে অনেক কিছু লেখার পর
সেগুলিকে মুছে ফেলা হয়েছিল। দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল
ও একটি চেয়ারে এসে বসল আর সামনে ঝুঁকে
আমাকে একটি সাদা চুলের নুটি এগিয়ে দিল।
ও চাইছিল যতক্ষণ না ও কিছু বলছে
আমি যেন ওটা রেখে দিই।
সাড়ে চারটে বেজে গিয়েছিল অথচ
আমি তখনো জেগেই ছিলাম।বিয়ের বাজনা
কিছুক্ষনের জন্য থেমে গিয়েছিল
সাদা রঙ ফিরে আসছিল দেওয়ালে।
বুড়ি,কিভাবে আমি চমকে উঠবো
সূর্যের আলো দেখে,যখন তা
সবকিছু নিখুঁত ভাবে ভেঙ্গে ফেলে?
একটি জরাগ্রস্থ বাড়ি কখনও
তার ছায়ার ওপর ঝুঁকে থাকে না।
২.
একটি দরজা খুলে ও
রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছিল
আমি ঘুমের ভান করে বিছানায় পড়ে ছিলাম
ও বিছানার ওপর আমার পায়ের কাছে বসল
আমি ওর হাতদুটো লক্ষ্য করলাম
একদম ওর বাবার মত হাতদুটো।এগারোটা বেজে গিয়েছিল
বৃষ্টির ভেতরেও সূর্য উঠেছিল
পাখিরাও জেগে গিয়েছিল
কিন্তু ওদের বাসার কাছেই জড়ো হয়েছিল
খুব তাড়াতাড়ি আবার অন্ধকার নেমে আসবে
আমার মুখের ভেতর আমি একজন
ঘোড়ার ডাক্তারের নেহাই দেখলাম
বুড়ি,আমাকে বলতো
এর মধ্যে গোঁয়ার্তুমির ব্যাপারটি কোথায়?
পাখিদের পা’গুলি বাঁধাই আছে
ওদের গলাও কেটে দেওয়া হয়েছে
আর বড় একটি মাটির মেডেলের জন্য
আমিও আমার কম্পাসটি বিক্রি করে দিয়েছি।
৩.
ও আসলে একটি ভুত,জাদুকাঠি,একটি ডাইনি
নিজের খেয়ালখুশি মত ও আসত
এমনকি বৃষ্টির মত শব্দও করত না
সূর্যাস্তের মত
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে থাকত
রোববার করে ও একটি
ম্যাপ বই খুলে বসত
আর একটি একটি করে পৃষ্ঠা ওলটাত
আমি দেখতাম একটি মহাদেশের কোনাগুলি
সমুদ্রের রঙের ভেতর গিয়ে পড়ছে
বুড়ি,আমাকে বুধের মৃত্যু সম্বন্ধে কিছু বলো
আজ রাতে আমি তোমাদের
অস্থির দেশে ঢুকে পড়বো
যেখানে ডাঙ্গা একটি জুতোর মত
জলকে দাবিয়ে রাখে না আর চাঁদ
তার সবটুকু আলো আকাশে ছড়িয়ে দেয়।
আমি আমার অক্ষরগুলি ছুঁয়ে বলছি
একদিন ওরা তোমার সাদা হাতের কাছে জেগে উঠবে।
ভাষান্তর : শৌভিক দে সরকার






.png)
.png)