• কবিতা সুর্মা


    কবি কবিতা আর কবিতার কাজল-লতা জুড়ে যে আলো-অন্ধকার তার নিজস্ব পুনর্লিখন।


    সম্পাদনায় - উমাপদ কর
  • ভাবনালেখা লেখাভাবনা


    কবিতা নিয়ে গদ্য। কবিতা এবং গদ্যের ভেদরেখাকে প্রশ্ন করতেই এই বিভাগটির অবতারণা। পাঠক এবং কবির ভেদরেখাকেও।


    সম্পাদনায় - অনিমিখ পাত্র
  • সাক্ষাৎকার


    এই বিভাগে পাবেন এক বা একাধিক কবির সাক্ষাৎকার। নিয়েছেন আরেক কবি, বা কবিতার মগ্ন পাঠক। বাঁধাগতের বাইরে কিছু কথাবার্তা, যা চিন্তাভাবনার দিগন্তকে ফুটো করে দিতে চায়।


    সম্পাদনায়ঃ মৃগাঙ্কশেখর গঙ্গোপাধ্যায়
  • গল্পনা


    গল্প নয়। গল্পের সংজ্ঞাকে প্রশ্ন করতে চায় এই বিভাগ। প্রতিটি সংখ্যায় আপনারা পাবেন এমন এক পাঠবস্তু, যা প্রচলিতকে থামিয়ে দেয়, এবং নতুনের পথ দেখিয়ে দেয়।


    সম্পাদনায়ঃ অর্ক চট্টোপাধ্যায়
  • হারানো কবিতাগুলো - রমিতের জানালায়


    আমাদের পাঠকরা এই বিভাগটির প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বীকার করেছেন বারবার। এক নিবিষ্ট খনকের মতো রমিত দে, বাংলা কবিতার বিস্মৃত ও অবহেলিত মণিমুক্তোগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে আনছেন, ও আমাদের গর্বিত করছেন।


    সম্পাদনায় - রমিত দে
  • কবিতা ভাষান


    ভাষা। সে কি কবিতার অন্তরায়, নাকি সহায়? ভাষান্তর। সে কি হয় কবিতার? কবিতা কি ভেসে যায় এক ভাষা থেকে আরেকে? জানতে হলে এই বিভাগটিতে আসতেই হবে আপনাকে।


    সম্পাদনায় - শৌভিক দে সরকার
  • অন্য ভাষার কবিতা


    আমরা বিশ্বাস করি, একটি ভাষার কবিতা সমৃদ্ধ হয় আরেক ভাষার কবিতায়। আমরা বিশ্বাস করি সৎ ও পরিশ্রমী অনুবাদ পারে আমাদের হীনমন্যতা কাটিয়ে আন্তর্জাতিক পরিসরটি সম্পর্কে সজাগ করে দিতে।


    সম্পাদনায় - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়
  • এ মাসের কবি


    মাসের ব্যাপারটা অজুহাত মাত্র। তারিখ কোনো বিষয়ই নয় এই বিভাগে। আসলে আমরা আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালবাসার কবিকে নিজেদের মনোভাব জানাতে চাই। একটা সংখ্যায় আমরা একজনকে একটু সিংহাসনে বসাতে চাই। আশা করি, কেউ কিছু মনে করবেন না।


    সম্পাদনায় - নীলাব্জ চক্রবর্তী
  • পাঠম্যানিয়ার পেরিস্কোপ


    সমালোচনা সাহিত্য এখন স্তুতি আর নিন্দার আখড়ায় পর্যবসিত। গোষ্ঠীবদ্ধতার চরমতম রূপ সেখানে চোখে পড়ে। গ্রন্থসমালোচনার এই বিভাগটিতে আমরা একটু সততার আশ্বাস পেতে চাই, পেতে চাই খোলা হাওয়ার আমেজ।


    সম্পাদনায় - সব্যসাচী হাজরা
  • দৃশ্যত


    ছবি আর কবিতার ভেদ কি মুছে ফেলতে চান, পাঠক? কিন্তু কেন? ওরা তো আলাদা হয়েই বেশ আছে। কবি কিছু নিচ্ছেন ক্যানভাস থেকে, শিল্পী কিছু নিচ্ছেন অক্ষরমালা থেকে। চক্ষুকর্ণের এই বিনিময়, আহা, শাশ্বত হোক।


    সম্পাদনায় - অমিত বিশ্বাস

ধানবাড়ি গানবাড়ি

আবহমানের শোলোকগাথা
অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

 “রিমঝিম বৃষ্টির মধ্যে, টিপটিপ বৃষ্টির মধ্যে শূন্যতা নিয়ে থই থই ভেসে গেছি আমি। আমার কোনও বন্ধু নেই। স্বজন নেই। ঈশ্বর নেই। পৃষ্ঠপোষক নেই। রাজনীতি নেই। আমি ঠিক স্বাভাবিক মানুষ নই। সতেজ যুবক নই। গুছিয়ে কথা বলতে পারিনা। গলা ছেড়ে গান গাইতে পারিনা। মস্তানের মতো দুরন্ত গতিতে সব কিছু দুপকেটে ভরে নেবার কৌশল আমার আয়ত্বে নেই। অন্ধকারে নিসর্গদৃশ্যের কিনার ধরে হাঁটি। নির্জনতা ভেঙে দূরে জেগে থাকে বিষণ্ণ ভাটিখানা। আমি মাতালের কাঁধে হাত রাখি। আর লম্পটের চোখের জলে ভেসে যায় আমার করতল”...এই ভেসে যাওয়ার পথ ধরে ধরেই একের পর এক দৃশ্যকল্প জন্ম নেয়। একেকটা আলেখ্য তৈরী করে লোককথার শরীর। যেন কথকের অদ্ভুত আলখাল্লার ভেতর থেকে একটা একটা করে উড়ে যায় জাদুপালকেরা যাদের নরম থেকে ঝরে পড়ছে ধানের গন্ধ, আলোর গল্প, ব্রতকথা আর পাঁচালীর সুর। গরুর গাড়ির ছইয়ের ভেতর দুলে উঠছে লণ্ঠণ, চিলাপাতার জঙ্গল থেকে ভেসে আসছে ফেউয়ের চীৎকার। ঢাকের শব্দে অন্ধকারে মিলিয়ে যাচ্ছে হস্তীযূথ। এক মুগ্ধ বালক এ সমস্তই তীব্র ক্ষুধায় লিখে রাখছে অলিন্দে নিলয়ে। কেননা এরপরেই অবশ্যম্ভাবী শুরু হয়ে যাবে তার অভিশাপের জীবন। “কাঁধে পাখি নিয়ে কিছুটা চাঁদের আলো ধার করে লম্বা নৌকোর ইশারায় বাক্সবন্দি কুয়াশার সঙ্গে তোমাকে চলতে হবে বাকি আয়ুস্কাল”। সে হাওয়াকলের নিচে ঠায় দাঁড়িয়ে থেকে পরতের পর পরত খুলে চিনে নিতে শুরু করে “কাঠের ঘরবাড়ি, জড়ীবুটি বিক্রেতা, বান্ধবীর হাতব্যাগ, পুরোনো চিঠির রূপকথা, শহরের নির্জন হাসপাতাল, আর ঝাউগাছের পৃথিবীতে বেড়াতে আসা অসংখ্য সাদা বেড়াল”। আমরা সনাক্ত করতে  পারি এই কথককে...যিনি আদ্যোপান্ত এক নির্জন কবি আসলে, পৃথিবীর সমস্ত শব্দ যার সামনে উবু হয়ে বসে। তিনি কবি সুবীর সরকার। “ধানবাড়ি গানবাড়ি” শিরোনামে তাঁর ব্যক্তিগত গদ্যের ছিমছাম সংকলন মুহুর্তে পাঠককে দাঁড় করিয়ে দেয় তাঁর ঔদাসীন্য আর নিঃসঙ্গতার মুখোমুখি অসামান্য এক পৃথিবীর দিকে মুখ করে। যা স্থানিকতাকে অতিক্রম করে যেমন ভুবনায়িত হয়ে ওঠে, আবার একই সাথে তাঁর শিকড়ের মাটির গন্ধটিকেও চিনিয়ে দেয় মুগ্ধতায়।  

কবি সুবীর সরকার তাঁর কবিতায় যেমন এক নিজস্ব ভাষা, আঙ্গিক, কথন ও শব্দপ্রয়োগের অনন্যতায় স্বতন্ত্র হয়ে ওঠেন, গদ্যকার সুবীর তাঁর সাথে পাশাপাশি হাঁটেন হাত ধরাধরি করে। কবিতা আর গদ্য কোথায় মিশে যায়, কোথায় পরস্পরকে জড়িয়ে আবার স্বতন্ত্র হয়ে ওঠে......সেসব বিচার না করেই এক নিঃশ্বাসে পড়ে নিতে  হয় গ্রন্থটি। তীব্র এক মায়ায় জড়িয়ে যেতে হয় এই জনপদের নিসর্গ আর তার সাথে  একাত্ম হয়ে থাকা মানুষজনের সাথে। সেখানে সাতাশি বর্ষীয়া বৃদ্ধা “সাইটোল সম্রাজ্ঞী”  নাচছেন। রাজবংশী মেয়েরা গাইছেন “ও জীবন রে, জীবন ছাড়িয়া না যাইস মোকে”। মজে যাওয়া ডোবা নালায় ফসফরাসের বাতি জ্বলছে নিভছে। বাবুলাল বাঁশফোঁড় হাঁড়িয়ার নেশায় দুলে দুলে কুলিলাইন পার হচ্ছে। মদেশিয়া যুবতীর খোঁপায় বনফুল হেসে উঠছে। গ্রাম্য মেলার কলরোলের ভিতর আলতা পা কিশোরিরা চুড়ি পরছে। কথকের চোখ এড়ায় না কিছুই--- হাটের মোরগলড়াই, হাতিঠাকুর, তিস্তাবুড়ি মনসাপালার গান, লালপার্টি করা হেরম্ব বর্মনের বাপ ,অন্ধকার মাঠঘাট নদিচর কাশঝপ ঘাসে ঢাকা সর্পিল পথ ঘুম ও ঘামে ভেজা অসহায়তায় আর্ত বিপন্ন প্রান্তিক   সময়পর্ব...এক পালাগানের সুর শরীরে জড়িয়ে যৌথ জীবনের অসামান্য উদ্‌যাপনপর্ব  সুবীরের এই গ্রন্থখানি।  সোনালী ধানের গন্ধে জীবনযাপনের লোকগান মকরমুখী বাঁশিতে ফুঁ দিতে দিতে থরে থরে সাজান কষ্টগুলো কান্না মত ঝরে পড়ে, গান হয়ে যায়। “ধানবাড়ি গানবাড়ি” পাঠ-অভিজ্ঞতা তাই এক মগ্ন যাপনের ভিতর দিয়ে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠা যেহেতু এই বই অবশ্যপাঠ্য এক কাব্যিক দলিল, এক অনতিক্রম্য শোলোকগাথা, আবহমান  দৃশ্যকাব্যের এক মনোরম উপস্থাপন। দূর্দান্ত প্রচ্ছদ ও ঝকঝকে মূদ্রণে সুখপাঠ্য গ্রন্থটি অধিকতর মনোগ্রাহী হয়ে উঠেছে।

ধানবাড়ি গানবাড়িঃ ৮০ টাকা
সুবীর সরকার
প্রকাশকঃ ধানসিড়ি
প্রচ্ছদঃ সেঁজুতি দাসগুপ্ত

       

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

মৃতের সহিত কথোপকথন : অর্ঘ্যর বিনয় এবং তাঁর বিনয়ী পাঠক

অর্ক চট্টোপাধ্যায়

ইন্টারভিউ এক সংলাপী ফর্ম হলেও সংলাপ মাত্রেই ইন্টারভিউ নয়। সংলাপ নাটকনভেলগল্প বিভিন্ন ন্যারেটিভেই থাকে কিন্তু ইন্টারভিউ ফিকশন নয় বলেই সেখানে প্রামাণ্যতার দাবি থেকে যায়। সেই যাচাইযোগ্যতার বাস্তববাদ সমস্যায়িত হয় যখন ইন্টারভিউ হয়ে ওঠে মৃতের সহিত কথোপকথন অর্থাৎ প্ল্যানচেট। অর্ঘ্য দত্ত বক্সীর ২০১৫র কলকাতা বইমেলায় প্রকাশিত গ্রন্থবিনয় মজুমদার: প্ল্যানচেটে যৌনসমীক্ষায় শুরু হয়েছে এমনই এক প্ল্যানচেট-ইন্টারভিউ দিয়ে।  অর্ঘ্য এই আলাপচারিতায় মৃত বিনয়ের যে ভাষ্য নির্মাণ করেছেন সেখানে বন্ধনীর মাধ্যমে বিনয়ের নিজের কথাগুলিকে চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে যেখানে যেখানে বন্ধনী ছাড়াও কথা বলেছেন বিনয় সেখানেও তার বিভিন্ন গ্রন্থে ও সাক্ষাতকারে বলা কথাগুলিকেই নিজের বয়ানে ও বয়নে তুলে ধরেছেন অর্ঘ্য। দীর্ঘ এই আলাপচারিতার শেষে লেখকীয় বন্ধনীর ভেতর তিনি পাঠকদের জানিয়েছেন যে এই লিখনে 'লেখক হবার কারিকুরি বিন্দুমাত্র প্রয়োগ করা হয়নিএবং তাঁর একমাত্র লক্ষ্য ছিল বিনয়ন্মোচন। এই ইন্টারভিউয়ে তাই প্রামাণ্যতার কোনো দাবি নেই এবং বিনয় এখানে দ্বিপ্রকার মৃত কারণ তিনি শুধু বাস্তবেই মৃত ননএই কাল্পনিক আলাপচারিতার কাল্পনিকতায়ও তিনি মৃত। এ এমন এক প্ল্যানচেট-সাক্ষাত্কার যা আগে ঘটেনি আর পরে কোনদিন ঘটবে না বলেই নিজেকে জানান দিয়েছে অর্ঘ্য প্রথমেই স্বীকার করে নিয়েছেনবিনয়ঋত্বিক আর কার্ল ইয়ুং তাঁর গুরু এবং এই বই রাধা কেলোনামা ও বিনয়ী না-কবিতা সিরিজ  (২০১১) নামক পূর্ববর্তী গ্রন্থের পর তাঁর দ্বিতীয় গুরুদক্ষিণা। হয়ত সেই কারণেই তথাকথিত নিরপেক্ষ এবং নৈব্যক্তিক সমালোচনাগ্রন্থ তিনি শুরু করেছেন বিনয়ের অথরিয়াল স্পেসের ভেতর থেকে। সমালোচনার সাবজেক্টিভিটি এই গ্রন্থের আবেগময়তার সম্পদ। বিনয়কে তাঁর নিজের নান্দনিক টার্মসে তুলে ধরতে চেয়েছেন অর্ঘ্য। তাই তাঁর কবিতা ও দর্শন বিষয়ক দীর্ঘ প্রেতালাপের পর তিনি প্রবেশ করেছেন বইটির দ্বিতীয় এবং শেষাংশে যেখানে যত্ন সহকারে পঙতি ধরে বিনয়ের কাব্যগ্রন্থ অঘ্রাণের অনুভূতিমালা  দ্বিতীয় দীর্ঘকবিতা 'বিশাল দুপুরবেলা'র সাইকোআনালিটিক যৌনবিশ্লেষণে হাত দিয়েছেন।

প্রশ্ন জাগে কেন অর্ঘ্য কথোপকথন শুরু করলেন বিনয়ের ভাবমূর্তির ক্যারিকেচারমার্কা ক্লিশে, উন্মাদনা দিয়ে। তাঁর ব্যর্থ গায়ত্রী-প্রেমউন্মাদনা আর তার মিথিফিকেশন তো এক আনক্রিটিকাল বিনয়-কাল্টযেমন ঋত্বিকের মদ্যপানযাকে নান্দনিক সর্বস্বতা দিলে কমলেশ্বরের ঘটক জাতীয় একটা সিনেমাটিক ডিজাস্টার তৈরী হয়। অর্ঘ্য বিনয়ের উন্মাদনাকে 'ঐশ্বরিকবলেছেন, কিন্তু অধম এই পাঠকের কাছে এমন মরমিয়াবাদী দাবির একটাই অর্থ হয় আর তা হল ঈশ্বর নিজেই উন্মাদ। আমার তো মনে হয়উন্মাদনাও ঈশ্বরকে অস্তিত্বশীল করে তুলতে অপারগ! অর্ঘ্যর বিনয় বলেছেন, গণিত প্রমাণ করেছে তিনি উন্মাদ নন। প্রমাণ করেছে তাঁর কবিতাও কিন্তু এই প্রমাণ কি নিতান্তই আবশ্যকপ্ল্যানচেটে নিজের তথাকথিত 'উন্মাদনানিয়ে বিনয়ের এই হতাশা এবং নিজেকে অনুন্মাদ প্রমাণ করতে চাওয়া আমার কাছে হতাশাজনক। বিনয় বা হোল্ডারলিন উন্মাদ নাকি উন্মাদনা নিজেই উন্মাদ নাকি আমরা মানুষেরা সকলে জন্মগতভাবেই উন্মাদ, এই সব আলোচনা স্রষ্টার সৃষ্টির জাদুকাঠি নয় বরং নিতান্তই অনুসঙ্গমাত্রতাই থাকুক না। নচেত কবিতাকে যুক্তিবাদী বা জাতীয়তাবাদী প্রভুত্বের প্রতর্কমুক্ত করা যাবে না! অর্ঘ্যকে ধন্যবাদ কারণ শুরুতেই এই প্রসঙ্গ আনলেও আলাপ দ্রুতই তাকে অতিক্রম করে অন্য অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোকপাত করেছে।  বিনয় খোলাখুলি কথা বলেছেন সৃষ্টিতত্ত্ব এবং তার এককত্ব নিয়ে; কবিতার জন্ম ও পাঠ নিয়ে বলেছেন আশ্চর্য কিছু কথা যাতে নির্মাতা আর ভাবুক বিনয়ের চমত্কার মেলবন্ধন চোখে পড়েবিনয়ের মত একজন কবির কাছে মহাজীবনের বোধ আর সেই বোধে জীব ও জড়ের নিবিড় টান কবিতারও জন্মরহস্য। বিনয় লিখেছেন, কবিতা শুধু মাথা দিয়ে পঠিত হয়নাপঠিত হয় 'সমগ্র শরীরদিয়েমৃত্যু অপর নয়মৃতপাখিও পাখিই বটে। অঘ্রাণের অনুভূতিমালাকে তিনি বলেছেন তাঁর ধর্মগ্রন্থ। সেটি 'আদিরসাত্মকঅথচ 'নারীভূমিকাবর্জিতযা অর্ঘ্যর কাছে স্ববিরোধিতা মনে হয়েছে যদিও আমার মনে হয় আদিরসের ভেতর আত্মকাম থাকতে পারে যেখানে যৌনতার ভাষ্য যৌন অপরের ওপর নির্ভর করে না। লাকানীয় মনোবিশ্লেষণে যৌনতা সম্পর্কের নয়বরং অ-সম্পর্কের প্রতর্ক কিন্তু আমরা বর্তমান আলোচনায় এই টেকনিকাল বাদানুবাদে নয় নাই বা ঢুকলাম। তাছাড়া আদিরসের যৌনতা সমলিঙ্গীয়ও হতে পারে যাতে নারীর ভূমিকা থাকে না। বিনয় অর্ঘ্যকে বলেন, এই বই ধর্মগ্রন্থ শুধু এইকারণে নয় যে এর ভেতর ঈশ্বরজিজ্ঞাসার দর্শন রয়েছে বরং 'একটি ঘোর থেকে অবচেতন ছলকে ছলকে উঠে এসে বইটি রচিত' এই আলোচনার সীমিত পরিসরেঅবচেতন আর ধর্মের এই উস্কানিমূলক সম্পর্কের জটিলতায় ঢোকা সম্ভব নয়শুধু এইটুকু বলা যায় যে ধর্ম এবং মনোবিশ্লেষণের এক দীর্ঘ অম্লমধুর সম্পর্ক রয়েছে। ইয়ুংগীয় ভাবনার অন্তর্গত মিথিকাল আর্কেটাইপ এবং 'কালেক্টিভ আনকনশাসএর তত্ত্বায়ন তাঁকে ধর্মীয়চেতনার কাছে নিয়ে যায়অন্যদিকে ফ্রয়েড ও লাঁকা ধর্মীয় প্রতর্ককে ব্যবহার করলেও তাকে 'ওয়ার্ক থ্রুকরে মনোবিশ্লেষণকে ধর্মবিশ্বাসমুক্ত করার চেষ্টা করেন। অর্ঘ্য ইযুংগীয়ান আর আমি লাকানিয়ান। এই প্রসঙ্গে এখানেই পিরিয়ড। 

লেখকীয় বন্ধনীর মধ্যে বিনয়ের কবিতায় প্রাত্যহিকতার অহরহ আনাগোনা নিয়ে যে অব্যর্থ মূল্যায়ণ করেছেন অর্ঘ্য, তা তুলে ধরছিঃ 'কোন বস্তুর যাবতীয় বাতিল করতে করতে যখন আর বাদ দিলে তার মৌলিকতা নষ্ট হয়সেই নিউক্লিয়াসের সরল নিরাভরণ নিরালঙ্কার বয়ান তার দিনপঞ্জীর কবিতা।এই উজ্জ্বল বিশ্লেষণ বিনয়ের ফান্ডামেন্টাল-ইজমকে এক 'জেনেরিক' (Generic) মাত্রা দ্যায় যা হয়ত গণিতের সাথে কবিতার মিলনের একটি বিশেষ বিন্দু বলে বিবেচিত হতে পারে। ফরাসী লেখক জর্জ পেরেক এই প্রাত্যহিক বিষয়হীনতার প্রবাহকে 'ইনফ্রা-অর্ডিনারিবলেছিলেন। এরপর বিনয় এবং অর্ঘ্য কবিতাপাঠের ও পাঠ প্রতিক্রিয়ার যে আলোচনায় যান তা যতটা অবয়ববাদী (structuralist) ততটাই 'রিডার-রেসপন্স থিওরি'র দ্বারা প্রভাবিত। কবিতায় কবির লিখিত শব্দপরম্পরা কিভাবে পাঠকের নিজের অভিজ্ঞতায় প্রতিভাত হয়ে উদ্বৃত্ত এক অর্থ উত্পাদন করে যেখানে কবির জীবনের ঘটনা প্রতিস্থাপিত পাঠকের জীবনচিহ্ন দিয়ে--এই প্রক্রিয়াকে ছুঁয়ে যায় মনজ্ঞ এই আলোচনা। পরবর্তী পর্বে বিনয়ের নিজস্ব শব্দনির্মাণ সম্পর্কিত বয়ান আগ্রহব্যঞ্জক। তাঁর মতে বাংলা ভাষায় ইংরেজির তুলনায় অনেক কম শব্দ রয়েছে বলে আরো বেশি করে শব্দনির্মাণ করা দরকারযেমন 'মোমেন্টাম'এর বাংলা হিসেবে বিনয়-সৃজিত 'গমত্ত্বশব্দটি। শব্দ নিয়ে এই আলোচনা অর্ঘ্যর হাতে তাত্ত্বিক চেহারা পায় যখন তিনি বিনয়কে বলেন, শব্দের অর্থ ও শরীর মানুষ ছাড়া অন্য কোন প্রাণীর পক্ষে বোঝা সম্ভব নয় আর তাই লাঁকানিয়ান তত্ত্বে মানুষ ভিন্ন অন্য কোন প্রাণীর অবচেতন স্বীকৃত নয়। বিনয় এই তত্ত্বের বিরোধিতা করে বলেন পাখিরা খেতে পারলে 'খাওয়াশব্দটি নিশ্চয় তার অভিধানে থাকবে কারণ 'চিন্তা মানেই শব্দের চলাচল' দেরিদার আলোচনা থেকে যদিও এমন একটা ছবি বেরিয়ে আসে যে লাঁকার কাছে মানুষই একমাত্র প্রাণী যে অবচেতন চিন্তা করতে সক্ষমএই প্রশ্নটিও আসলে অনেক বেশি জটিল এবং অনেক কম মীমাংসাস্বাপেক্ষ। মানুষ ছাড়া অন্যান্য প্রাণী যেমন কুকুরবিড়াল কিম্বা সজারু সাইকোআনালিসিস করাতে এলে তাও একটা বিহিত হতে পারতো! কিন্তু আসে নাআসে মানুষ। তাই লাঁকাও তার প্র্যাকটিসের ওপর দাঁড়িয়ে শুধু মানুষের অবচেতনের কথাই বলতে পারেন। লাঁকা বিনয়ের মতই চিন্তাকে ভাষার বাহির বলে মনে করেন না। তাঁর মতে, 'there is no other thought [...] pure thought, thought not submitted to the contortions of language; in other words, extended thought.' লাঁকানিয়ান মনোবিশ্লেষণে অবচেতনের দুটি ভিত্তিপ্রস্তরের একটি ভাষা হলে অপরটি হলো শব্দের শরীরে সংবাহিত এক রমনীয়তা যাকে তিনি 'jouissance' বা রমণ বলে চিহ্নিত করেন আর মানুষ ছাড়া অন্য প্রাণীদের মনুষ্যভাষা আছে কিনা আমাদের সঠিকভাবে জানা না থাকলেও লাঁকা সুনিশ্চিত যে 'jouissance' অন্যান্য প্রাণীর মধ্যেও রয়েছে। লাঁকার মতে, 'if there is something that gives us the idea of "enjoy yourself", it is the animal.'  তিনি কখনই অস্বীকার করেন না যে অন্যান্য প্রাণীরা চিন্তা করতে পারে না। বরং হেজহগ নিয়ে বিখ্যাত একটি উক্তিতে লাঁকা পরিস্কারভাবেই বলেন যে হেজহগ তথা অন্যান্য প্রাণীরা মানুষের মতই শুধু মাথা দিয়ে নয়বরং গোটা শরীর দিয়ে চিন্তা করে থাকে। বিনয়ও তো বলেছেন পাঠক তার সমগ্র শরীর দিয়ে কবিতা পড়ে। এই আলাপচারিতার পরবর্তী পর্বে বিনয় মজুমদারের জীবনরাজনীতিলিখনপ্রভাব ইত্যাদি নানা বিষয়ে আলোচনা চলতে থাকে। এই অধমের নজর কাড়ে আস্তিক্য এবং নাস্তিক্যের প্রশ্নটি। বিনয় সেখানে বিশ্বাস ও কমিউনের এক অন্তর্বর্তী স্পেস খুঁজে ন্যান। রবীন্দ্রনাথের আস্তিক্য আর জীবনান্দের ব্যর্থ ঈশ্বরসন্ধানের মাঝে কোথাও নিজের কাব্যগহরে নিবিষ্ট হন মহাকবি। এছাড়া নিজের লেখা পুরোনো কবিতা বহুবছর পর পড়তে গিয়ে তাতে অজ্ঞাত নতুন অর্থের উন্মেষে বিনয় যে কাব্যিক 'অতিচেতনা'র কথা বলেন তাও এই প্রেতালাপের শেষাংশের সম্পদ। 

এবার আসা যাক এই গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশে যেখানে 'বিশাল দুপুরবেলা'র যৌনবিশ্লেষণ করেছেন অর্ঘ্য। তাঁর গুরুর কাছে নতজানু হয়ে তিনি আবারও জানিয়েছেন অন্তিম লেখকীয় বন্ধনীর ভিতর যে আর কিছু না হলেও পাঠককে এই দীর্ঘকবিতাটি ভাগ ভাগ করে পড়াতে পারাটাও তাঁর পরম পাওয়া। সত্যি পরম পাওয়াই বটে। তবে এই প্রাপ্তি ছাড়া প্রবন্ধের অন্যান্য প্রাপ্তির দিকে এবার আমরা সংক্ষেপে মন দেবো। এটি বিদ্যায়তনিক সন্দর্ভ না হলেও অর্ঘ্যর লেখায় সাইটেশনের সামূহিক অনুপস্থিতি চোখে লাগে। ফ্রয়েড আর ফুকো নিয়ে এক লাইনের মন্তব্যগুলি সরলীকরণের উপরিতলে রয়ে গ্যাছে; সেখানে গভীর পাঠ বা সমস্যায়নের দারিদ্র্য লক্ষনীয়। অর্ঘ্য নিজেই তাঁর লেখাকে সাইকোআনালিটিক ক্রিটিসিজম বলেছেন অথচ ইয়ুং বা অন্য কোনো চিন্তকের সাথেই সেভাবে এনগেজ করেননি তিনি, লেখার ভেতরে পাঠ করেননি তাঁদের তত্ত্বায়ন। সাহিত্যে সাইকোআনালিটিক ক্রিটিসিজমের একটি একশো বছরেরও পুরোনো ধারা রয়েছে যেখানে ফ্রয়েডীয় অনুসরণের ক্ল্যাসিকিয়ানায় সাহিত্যের টেক্সটে সাহিত্যিকের বা তাঁর চরিত্রের মনোবিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে কিম্বা লেখাটিকে অবচেতন মনের বর্ণমালা বলে ধরা হয়। Text mirrors unconscious--এই আলেগরিকাল ধারায় সাহিত্যে যৌনতার ব্যবহার অবশ্যই বিবেচ্য কিন্তু সম্প্রতিকাকলে আমরা এই ক্ল্যাসিকিয়ানা পেরিয়ে সাহিত্যে সাইকোআনালিটিক ক্রিটিসিজমের যে নব্য-ধারায় এসেছি সেখানে টেক্সটের বিনির্মাণ গুরুত্বপূর্ণগুরুত্বপূর্ণ অর্থের নেতিকরণ প্রক্রিয়াটিকে দেখানো। যৌনতা লাঁকানীয়-দেরিদীয় ভাষ্যে কেবল দুটি শরীরের সঙ্গম ও রতিক্রিয়া নয়, যৌনতা শব্দের ভিতর-বাহিরে স্থিত এক রমণ-গমত্ত্ব, শব্দের অন্তর্গত এক নিজস্ব ইরোটিসিজম। এই যৌনতা কিভাবে এপিস্টেমলোজির সর্বজ্ঞতায় আঘাত হানতে পারে তা দেখানো অধুনা সাইকোআনালিটিক ক্রিটিসিজমের মুখ্য উপজীব্যএইদিক থেকে অর্ঘ্যর আলোচনা নিবিড় পাঠে উজ্জ্বল হলেও ক্ল্যাসিকিয়ানায় ভরপুর। তিনি বিনয়ের ল্যান্ডস্কেপ বর্ণনার সাঙ্কেতিকতা থেকে রতি, রমণ ও সঙ্গমক্রিয়ার আলেগরি তুলে ধরেছেন যেখানে লেখক ভীষণভাবেই জীবিত এবং বারবার নিজের পাঠকে প্রামাণ্যতা দিতে অর্ঘ্য বিনয়কে অথর-গডের মতই ব্যবহার করেছেন।
যৌনতা আর সঙ্গম এক হয়ে গেছে এই আলোচনায় যা সাইকোআনালিটিকালি উদ্বেগজনক। দুই পাহাড়ের মধ্যবর্তী উপত্যকা তাই সহজেই দ্বিতীয় যোনি হয়ে উঠেছে, ঘাস, যোনিরোম আর হ্রদ যোনি। এই সরলীকৃত সিম্বলিজম কিন্তু বর্তমানে অনুন্নত সাইকোআনালিটিক পাঠের বৈশিষ্ট্য বলেই চিহ্নিত হয়। এই আলোচনার প্রান্তে কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন অর্ঘ্য যেগুলোকে তিনি বিশেষ কোনো গন্তব্যে নিয়ে যাননি কিন্তু আমার মনে হয় ওই প্রান্তিক প্রশ্নগুলিই এই পুরাতনপন্থী আলোচনাকে নতুনের স্পন্দন দিতে পারতো। এরকম কয়েকটি প্রসঙ্গের দিকে নজর দেওয়া যাক। বিনয়ের কবিতায় ব্যবহৃত 'সসীম ইনফিনিটি'র গাণিতিক ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যেতো যৌনতার প্রতর্ককে, যেমনটা করা হয় একবিংশ শতকের মনোবিশ্লেষণে, প্রধানত লাকানিয়ান প্ররোচনায়। পুরুষের যৌনতা আর নারীর যৌনতার মধ্যে কেমনভাবে বিভাজিত হয় সসীম ও অসীম? এই ইনফিনিটির প্রতর্কের সাথে কি সম্পর্ক সেট থিওরি বা টোপলজিকাল জিওমেট্রির? এই প্রশ্নগুলি আমাদের সময়ে সাইকোআনালিটিক ভাবনার কেন্দ্রীয় জিজ্ঞাসা আর বিনয়ের গাণিতিক পান্ডিত্য প্রশ্নগুলিকে আরো প্রাসঙ্গিক করে তোলে। আলোচনার এক জায়গায় অর্ঘ্য মন্তব্য করেন, 'দেখুন এ কবিতার যৌনক্রীড়ার কোন শেষ নেই। এই অন্তহীনতার প্রশ্নটিকে ফিরিয়ে আনা যেতোইনফিনিটির বিশ্লেষণে। যৌনতা কি স্বততই অসম্পূর্ণ, এমনকি ট্রমাটিক? এই প্রশ্নটি উঠে এলো না সম্ভাবনা সত্ত্বেও। অর্ঘ্য লেখেন, 'সব মিলে একক গণিকা শরীর, দর্শন হয়ে থাকে গোটা যৌনমুক্তাঞ্চল।এই যৌনমুক্তাঞ্চলে ক্ষমতার বিষয়ে অর্ঘ্য নীরব যদিও আলোচনার শুরুতেই তিনি ফুকোর ক্ষমতাতত্ত্বের উল্লেখ করেছিলেন। এরপর মার্কসের শ্রমতত্ত্বের 'লিবিডিনাল ফেটিশিসিজম'ও তেমনই এক অব্যবহৃত রেফারেন্স। যৌনতা আর শ্রম, বিপ্লব আর অবচেতন, মনোবিশ্লেষণ আর মার্কসবাদের তাত্ত্বিক সূত্রায়নের দীর্ঘ আলোকধারায় হতে পারতো কোনো নতুন সংজোজন কিন্তু হয়নি। আলোচনার আরেকটি জায়গায় অর্ঘ্য লেখেন 'সকল শব্দই যৌনতাময় শব্দ' কিম্বা অন্যত্র, 'ভাষা ক্রিয়া ভিত্তিক, এবং সব ক্রিয়ার শ্রেষ্ঠ ক্রিয়া যৌনতা'অন্যঅংশে রমণের গতির এক উদ্দীপনাময় উল্লেখ পাই কিন্তু আবারওঅর্ঘ্য এই গতিকে কোনো গতিমুখ দেননি এমন গহীনবাক্যগুলি এই লেখায় খাদের ধারে অযত্নে পড়ে থাকা মনিমানিক্য। লেখক অন্তত এই লেখায়তাদের কদর বোঝেননিব্যক্তিগতভাবে আমি কালেক্টিভ আনকনশাস তত্ত্বের সমর্থক না হলেও অর্ঘ্যর আরেকটি প্রতিশ্রুতিময় বাচন হতে পারতো যদি দেখানো যেতো কিভাবে বিনয়ের কবিতায় গণিত এবং মিথিকাল অবচেতন উভয়ই সামান্যিকরণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করে। কিন্তু অর্ঘ্য শুধুই গণিত এবং ইয়ুংয়ের এই প্রবণতাগত সাদৃশ্যকে উল্লেখ করে প্রসঙ্গান্তরে চলে যান। আর তাছাড়া গণিত মাত্রেই সামান্যিকরণ করে এও এক সামান্যিকরণ। ডিডাক্টিভ ম্যাথেমাটিক্সের কি হবে? তবে এইসব সূক্ষ সমস্যা সত্ত্বেও অর্ঘ্য দত্ত বক্সীর বিনয় মজুমদার: প্ল্যানচেটে যৌনসমীক্ষায় লেখকের সততা এবং ঐকান্তিক বিনয়পনায় আলোকিত; তাঁর গদ্য সুখপাঠ্য এবং বিশ্লেষণ সংযত। অভিমুখের অভাব থাকলেও তিনি বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে ধরেছেন আর সর্বোপরি বিনয়ের কবিতা ও চিন্তন এই গ্রন্থের আকর: 'যে কোন কাহিনী তাই যৌনাঙ্গের আত্মকাহিনীই/ যে কোন চিন্তাই তাই এই চিন্তাকারীটির একক জীবনী হয়ে যায়।' পাঠক সঙ্গে থাকুন অর্ঘ্যর এই মেধাবী অভিনিবেশের।  


বিনয় মজুমদার: প্ল্যানচেটে যৌনসমীক্ষায়
প্রকাশকঃ প্রতিষেধক
প্রকাশকালঃ জানুয়ারী, ২০১৫
মূল্যঃ ২০ /-
             


        

'ঈভ, একটি ডালিমক্ষেতের বিজ্ঞাপন'

প্রিয় দোলন

তোর বই আমায় আরেকটু জ্বালানি দিল,বেঁচে থাকার!এক অনির্দেশ্য সারাৎসারের কাঁধে চেপে তোর কবিতা বিশদে চলে গেছে!মনে হয়,এই কি সেই ফোরথ ওয়ার্ল্ড যেখানে জল খাওয়ার শব্দে ভরে যাচ্ছে পেট নাকি এক বানানো কবিতার জগতে বসে আমরা এতদিন থেকে গেছি যার যার নিজস্ব দেশলাইপাতার ঘরে!

দোলন আমি কবি নই,তো আমার পড়ায় কবিদের কনফিডেন্ট জাজমেন্ট পাবিনা!আমি ক্রিটিকও নই,তোর কবিতা কি ভাবে লিখলে আরো সম্পূর্ণ হয়ে উঠতো এও আমি বলতে পারবো না!আমি সেই লোক যে আলো দেখতে পায়,জ্বালাতে পারেনা!তোর বই-এ রাখা আলো,আমার আলো হয়ে উঠেছে!অন্ধকার,আমার অন্ধকার!পাঁচটি ভাগের কবিতায় তুই গঙ্গাকে স্রোতল রেখেছিস;কিছু তরঙ্গবিক্ষোভ,কিছু তল,অবতলের বিভঙ্গ,  কিছু চাপল্যও আছে,আর আছে হাত দিয়ে ছুঁয়ে থাকা জীবনের ধ্বক ধ্বক আওয়াজ!

কথকতা পর্যায়ে তোর আত্মিক পরিক্রমা প্রগলভ হয়ে উঠতে পারতো!মৃত্যু ,এ ভাবে একটি অলীক আর্দ্রতার নাম,একটি অক্লান্ত পরগনালিখেই তুই কবিতার সারাৎসারে চলে যাস,এরপরে পড়া হয় তারই অনুরণন!ব্যক্তিগত তমাল গাছের পাতা উৎপল কুমার বসুকে মনে পড়ালেও তুই নিজের সন্তসুলভ দেখায় চলে গেছিস,যেখানে কথা দর্শন হয়ে ওঠে,এই দুনিয়ার স্ববিরোধী মানবসভ্যতার শিকড়ে চলে যায় তোর লেখা,যেখানে অবিশ্বাস বিশ্বাসের হাহাকারে লেপ্টে যায়,যেখানে এখনও ছায়া,নিষিক্ত ভ্রুণের মতো আনন্দ পারাপার করে... পাঠক হিসেবে আমি আমার পারিপার্শ্বিকের নির্বিকার আপোষময়  অবস্থানে নিজেকেই বিদ্ধ হতে দেখি,ক্লান্তি ঘিরে আসে জীবনের মুখর বিজ্ঞাপনে আবার তাতে নিশ্বাসের সজীব উত্তাপও লেগে থাকে,মনে হয় আমিও বলি,জলের অভিসারে ফাটল ধরেছিল দেখো। এক বিস্তৃত আগ্নেয়গিরি জেগে উঠেছে..

যাপন কথাটা বিরক্তিকর হলেও হম জীতে হ্যাঁয়!আদা জাফরির লেখায় পড়েছিলাম, জরদ পাত্তোঁকো লে গই হাওয়া/শাখ মে শিদ্দত-এ-নুম্মু হ্যায় অভি/বরনা ইনসান মর গয়া হোতা/কোই বেনাম জুস্তজু হ্যায় অভি(হলুদ পাতাদের নিয়ে গেছে যত হাওয়া/প্রশাখায় তবু গভীর  জীবনকনিকা/ নইলে তো মরে যেতই মানুষ মানুষী/কোথাও তো আছে বেনামী খোঁজের চাওয়া),একটা অক্ষম অনুবাদও করে দিলাম কারণ আমার মনে হয়েছে তোর এই যাপনবিন্যাসের অসহায়তায় যে একমাত্র উদ্দীপকটি আছে সেটি ওই বেনাম জুস্তজু,নইলে তোর রাজনীতি/সমাজবোধ/বীক্ষা/সচেতনতা রক লজিকের পাথরে মুখ থুবড়ে পড়ে যেত,ওই জুস্তজুতোর কবিতায় এত সচলতা এনে দিয়েছে এ ভাবেঃ

১.গাছে আলো দেয় ছায়া দেয় অক্সিজেন মনস্তত্ব উদাসীন মর্ষকাম/কর্ষণযোগ্য জলাভূমি সব দেয়/কাঁটা দেয়/সাবধানে থেকো।

২.নিজেকে যিশু ভাবতে শুরু করো/ভাবো,তোমার স্পর্শে সব কুষ্ঠ সেরে যায়

৩.ট্রামলাইনে মাখো মাখো করে রাঁধছে মরশুমখেতে আসবে না?


দ্রোহ পার হয়ে আসি,কবিতা আরো বিশদ হতে থাকে,যেন ভাঙা গল্প,ছিন্নবিষাদ মাখা আনন্দের রং লিখে যাস তুই!গোল ভাবের মধ্যে বুঝি একটা আদর আছে/ঘিরে থাকার অভ্যাস..কবিতাও তাই,যাচ্ছেতাই সময়ে দাঁড়িয়ে সে কবির আদর চায়।কেউ পারে,কেউ পায়ে দলে চলে যায়!তুই পেরেছিস,এই পারা তোকে আরো সজাগ করুক,লিখতে থাক এমন পংক্তি যাতে আমার মত অভাজনের মনে হবে,তু তো আখির রো লিয়া/ পর ম্যায় রোনে কা কাবিল না রহা...তোর কবিতা কান্নায় জমে থাকা সেই শিশিরসমুদ্র যাতে শয্যা মাস্তুলহীন হয়েও সাহসে ভেসে যায়,মনে হতে থাকেঃ কেউ আছ/যার স্তব্ধতার কাছে সমস্ত মুখরতা ঋণী?মনে হয় শস্যমাদুর সংক্রান্ত আবহে বিষন্ন ,নাম হল সন্ধ্যার/যেমন কুকুরের নাম নেড়ি..এই উইট,অসামান্য!কবির কথকথার অমন বিস্তার থেকে তুই চলে এসেছিস এরকম সঙ্কেতময়তায়ঃবারান্দায় শুকনো পরিজ/কী একটা চূড়ান্ত,অপেক্ষার,সেই অপেক্ষাই তোর নারীজন্মকে মানবজন্মের  সঙ্গে গেঁথে দিয়েছে,তোর কবিতা আর ইস্যুবিদ্ধ বা সময়বিদ্ধ হয়ে থাকেনি,এবার তোকে ঠিক করতে হবে তুই চির সময়ের দিকে যাবি কিনা!তোর পা কিন্তু সময়ের বাইরে এসে পড়েছে,এই বই,ঈভ,একটি ডালিমক্ষেতের বিজ্ঞাপনসেই পদক্ষেপের ফসল!
ভাল থাকিস,ভালোবাসাসহ

স্বপন-দা         

       

অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

বাতিঘর ও জাহাজের গল্প

নতুন ও পুরানো কাগজের মাঝখানে দাঁড়িয়ে/ আমি ঘুড়ি ওড়াচ্ছি/মাঝে মাঝে ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিচ্ছি/স্বদেশ ও বিদেশ/ এখন দুই দেশেই বৃষ্টি হচ্ছেনতুন ও পুরানো কবিতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে তিনি ঘুড়ি ওড়াচ্ছেন।  মাঝে মাঝে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিচ্ছেন এঘর ওঘর। এখন দুই ঘরেই বৃষ্টি হচ্ছে। আর বৃষ্টিজলে ধুয়ে শ্যামলে শ্যামল হয়ে উঠছে কবিতার ধূলোবালি। মেঘসম্ভাবনার ডানা ধরে আকাশে ছুঁড়ে দিয়ে চুপচাপ সরে গেছিলেন মিতবাক মানুষটি। আকাশ-ভর্তি জামার গল্প থেকে স্বাধীনতা দিবসের গান গাইতে গাইতে পাখির জন্মদিন আঁকা হয়েছিল সেদিন। চাঁদ ও খোঁড়া বেলুনওয়ালার কবি ছয় পয়সার জীবনের বাইরের সেই সাদা গোলকের চোরা টানের কাছে বারবার নামিয়ে রেখেছেন ভেজা অক্ষরমালা। যে চাঁদ নষ্ট করলে মানুষ ভিখারী হয়। যে চাঁদের অনুবাদ করার দুঃসাহস নিয়েই লেখা হয় সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধ। ২০০২ সালে প্রকাশিত যে ক্ষীণতনু বিস্ফোরক ভর্তি বই তেরো বছর পরেও ফিরে পড়ার পর দেখি কবিতার প্রতিটি লাইনে উড়ছে রুমাল/ লাল, সাদা ও কালো রুমাল/ রুমালের তলায় চিঠি/চিঠিতে বহুতল বাড়ি/ বাড়ির তলায় বহে যাচ্ছে নদী/ নদীতে ভেসে উঠছে যুবকের মৃতদেহদেখি শ্যামল কি ভয়ানক পৌনঃপুনিকতা বর্জিত। একটা ছোট্ট বৃত্ত, তাকে ঘিরে আরো এক, তাকে ঘিরে ঘিরে ক্রমশই বড়ো বৃত্তেরা...সমান্তরাল। কোনো বিচ্ছিন্ন লাইন হঠাৎ কবিতা হয়ে উঠলো বা একই বিষয়ের আলাদা আলাদা উপস্থাপনার পুনরাবৃত্তিএসব থেকে বিপজ্জনকভাবে মুক্ত শ্যামলের কবিতা। মানে-বই হীন শ্যামলের কবিতা।  সাদা ভাত ও লাল শাকের মাখামাখিতে যে রক্তলাল তীব্রতায় জীবনের প্রথম কবিতাটি তার ভাতের থালায় লেখা হয়েছিল---সেই প্যাশনকে খুব সন্তর্পণে কবিতার মধ্যে দিয়ে গড়িয়ে যেতে দিয়ে, চুঁইয়ে যেতে দিয়ে আপাত নিরীহ শ্যামলের কবিতা। চেতন ও অবচেতনের মধ্যে দিয়ে ছোট ছোট ধাক্কা দিতে দিতে যাওয়া শ্যামলের কবিতা।  সূর্যাস্ত আঁকার নিষেধাজ্ঞার আগে সে জানত সূর্য আঁকা নিষেধ। সে তাই চাঁদ আঁকছিলযে চাঁদ আঁকতে আঁকতে মারা  যায় তার বাবা ও ঠাকুর্দা। যে চাঁদ আঁকতে আঁকতেই বাঘের মুখ থেকে একদিন লাফিয়ে পড়ল চাঁদ। এই কুড়িয়ে পাওয়া চাঁদ পকেটে পুরেই শ্যামল খুঁজতে বেরোলেন গাছেদের জন্মকথা। নিজেকে শূণ্যের ভেতর রেখে উলটো দিক থেকে কথা বললেন আর তাঁর ভেতরে জন্মালো গাছ। আর কি আশ্চর্য সেই গাছেদের ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল শিশুদের কান্না! এ কি সেই শিশু যে আস্তে আস্তে রাত হয়ে গিয়েছিল শ্যামলেরই কবিতায়? টেবিলের ওপর জ্বলজ্বল করছে টমেটো/তুমি কি বিবাহিত?এত সোজাসাপটা ভঙ্গিমায় আর কে কবে ছুঁড়ে দিয়েছিল প্রেমনিবেদন? মারাত্মক একটা চিত্রকল্প যেন একটা বুলেটের মত পাকা টমেটোর মাঝখান থেকে ফিনকি দিয়ে ছড়িয়ে দিলো লালের তীব্রতা, চাপা যৌনতা ও নিষেধের মৃদু লাল রেখাটিকে। জ্বলজ্বল করে ওঠা কামনাবিন্দুকে। একটা না দেখা দরজা যা লুকিয়ে ছিলো প্রতিদিনের আবর্জনা ঠাসা বাতিল আলমারিটার পেছনে, যা আমাদের অজ্ঞাতে আসলে এক গোপন ওয়ান্ডারল্যান্ডের পাস্‌ওয়ার্ড---তাকেই শ্যামল হাট করে খুলেছেন সেই পাঠকের কাছে যারা খুঁজে পেতে পড়ে নিতে জানে সেই কোড ল্যাঙ্গুয়েজ। শ্যামলের সংকেতময় পৃথিবী তখন অন্য একটা না-দেখা জগতের, অন্যতর বাস্তবতার মুখোমুখি একেবারে অসহায়ের মত বোল্ড আউট করে ছেড়ে দেয় তাকে। সে তখন দ্যাখে তাঁর কোন কুটুম্ব নেই। টিয়াপাখির কাছে সে ফেলে এসেছিল শিস্‌। তার শরীর জুড়ে শুধু  জন্মদিন। জ্বর হলে তার মনে পড়ে ভাস্কো-দা গামার কথা, মাছের বুকের ভেতর থেকে গড়িয়ে পরে ঘুঙুর।তার ঘরের ভেতর ঢুকে পরে জাহাজ। তার আদার ব্যাপারীর গতানুগতিকতা চমকে ওঠে সেই জাহাজের গল্পে, লোণা জলের ধাক্কায়। গাছের ভেতর জমে থাকে প্রচুর কথা। আকাশে ঝুলতে থাকে লন্ঠন, গান সাজাচ্ছে ঘোড়াকে---আর ঘুড়ি ওড়াতে ওড়াতে এক চাঁদ পাগলের সাথে এক সূর্য পাগলের দেখা হলে পাখিদের সাক্ষী রেখে এই দিনের আলোর স্পষ্টতা ও পূর্নিমার কুহকের দোলাচলের ভিতর শ্যামল লিখতে থাকেন---
কিছু শব্দ থাকে চোখের ভেতরে গোপন
কিছু শব্দ থাকে কানের ভেতরে গোপন
তারপর শুরু হয় পথ চলা
-----------------------------------------বাতাস রচনা করে বাকি অংশটুকু।
(সূর্যাস্ত আঁকা নিষেধঃ শ্যামল সিংহ
মূল্য-তিরিশ টাকা)   
  




পবিত্র আচার্য্য

বরফবন্দীর ডায়েরি, আষিক

এবারের বইমেলার অন্যতম সেরা সংগ্রহ আষিক এর কবিতার বই বরফবন্দীর ডায়েরি। কয়েকটা দিন খুব মন দিয়ে পড়লাম। নিঃসন্দেহে বলা যেতে পারে কবিতা পিয়াসু মানুষের কাছে এ এক অনন্য রসদ। সাহিত্যের রানী বলা হয় কবিতাকে। বাকী অন্যান্য সাহিত্যের থেকে তাই কবিতার প্রাধান্য অনেকটাই অন্যরকম। একটু আলাদাভাবে একে উপলব্ধি করতে হয়। জীবনকে অনুভব করি আমরা সবাই। কিন্তু আলাদা করে শব্দের সিম্ফনিকে কাছে ডেকে আনার অসীম ক্ষমতাবানই একমাত্র কবি। সেই অর্থে আষিক ছাপিয়ে গেছে সমস্ত পাঠক কুলের সার্বজনীন গ্রহণ যোগ্যতায়। কীভাবে গড়ে ওঠে একটা কবিতার শরীর? কীভাবে অদ্ভুত স্পন্দন জুড়ে দেয় কবি কবিতার শরীরে? এই ভাবনার সাথে জুড়ে যায় বাস্তবিক অক্লান্ত পরিশ্রম। বইটির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোথাও একচুল ভাটা পড়েনি কবির ভাবনা শক্তির। বরঞ্চ যতই এগিয়েছে কবিতার সহস্র ডালপালা, তাঁর তন্নিষ্ঠ পরিশ্রম এবং অনুসন্ধানী মনের স্পষ্ট স্বাক্ষর ভাস্বর হয়ে ফুটে উঠেছে।

বইটির শুরুতে ঝাঁ-চকচকে গদ্যের ভঙ্গিমায় কবি নির্দিষ্ট করতে চেয়েছেন তাঁর এই কাব্যগ্রন্থের পেছনে ছুটে যাবার কারণ। খুঁজে বেড়াচ্ছে কি নিয়ে বেঁচে থাকছে এই এত এত প্রাণ। যেন এই ভাবনারাই ছোটাতে বাধ্য করেছে তাঁকে। খোলামেলা ভাষায় অকপটে স্বীকার করে নিচ্ছেন মুহূর্তের খন্ডচিত্র থেকে কীভাবে বেরিয়ে আসে কাহিনী। আর কীভাবে ফ্রেমবন্দি হয়ে যায় অনুচেতনার স্বর। একটি জীবনের কাহিনীরা জীবন্ত হয়ে ওঠে। কবি বলছেন শরীরের ভেতর জমাট বাঁধছে বরফ। শরীরের ওপরে আস্তর পেরিয়ে কেউ কিছু জানতে পারছে না। সেই স্থির সময়ের অস্থিরতার কথাই বরফবন্দীর ডায়েরি

বরফবন্দীর ডায়েরি এর সাথে সজ্ঞানে কবি জুড়ে দিচ্ছেন সামাজিক মূল্যবোধ আর ভাবনার নিরবচ্ছিন্ন রেখাপথ। গল্পে গল্পে বলছেন একফুট, দু-ফুট, ইঞ্চি ছয়েক একটা গোটা সমাজকে সে লাইন পেরিয়ে যেতে উস্কোতে থাকে। পেরতে না পারলে, নিদেন পক্ষে লাইনকে ছুঁয়ে ফেলাও যায়! সেই মাতাল কতটুকু জানে? বরফ পড়তে শুরু করলে লাইন ও রাস্তার রঙ এক হয়ে যাবে।  বিমূঢ় তলাতল থেকে উঠে আসা জীবন দর্শন। কবি আলাদা করে কোন সীমানা রাখতে চান না। জীবনের শেষ স্টেজে যেখানে অমোঘ শীতলতা সেখানে সীমানা আর রাস্তার ভেদাভেদ হীনতায় নজরে আসে। ঢাকা পড়ে যায় সকল বৈপরীত্য।

প্রতিটি কবিতাই আক্ষরিক অর্থে মূল্যবান দলিল। প্রথম কবিতাটিতেই একটি অনবদ্য চিত্রপট তুলে ধরেছে কবি। এক যুদ্ধের দিনের ছবি। কোন এক মনখারাপের শহরে যুদ্ধ হচ্ছে / বুটের তলায় ভেঙ্গে যাচ্ছে বরফ। সেই একই দুর্যোগের দিনে যুদ্ধকে গল্প বানিয়ে এক বৃদ্ধ গল্প বলছেন বাচ্চাদের। এ যেন প্রবহমানতার সত্যতা। যুদ্ধ, ক্ষয়-ক্ষতি যেভাবেই বয়ে চলুক না কেন, গল্প থেমে থাকে না। থেমে থাকে না মানুষের জীবন।

এভাবেই যতই কবিতার রথ এগিয়েছে তরতরিয়ে অনুভূতির চিকণ রশ্মিগুলো এসে পড়েছে লেন্সের ভেতর। এই দৃশ্য দর্শন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করা যায় না একবিন্দু। কবিতার কথাগুলো বাজে নিরন্তর। চোখ দিয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা যায় পৃথিবীর ভঙ্গুর শরীর। এই ভুতলৌকিক জীবনসত্ত্বা কতটা অথই! চোখ দিয়ে স্পর্শ করছে গোটা পৃথিবী। শুধু কতগুলো কবিতার লাইনই শুধু নয়। জীবনধারাকেও নতুন ভাবে পাঠ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। একেকটি শিরোনামের আড়ালে জমা হয়েছে গুচ্ছ কবিতা। কোনটিই একে অপরের চাইতে বড় নয়। তবে বিশেষ ভাবে কতগুলো কবিতার লাইন ঝঞ্ঝিত হয়ে আসছে। যাকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে মাথায় বসিয়ে নিয়েছি অবলীলাক্রমে। তারই কয়েকটি শেয়ার করতে চাই।

তুমি দেখ / গান্ধার ধৈবৎ ছুঁয়ে কীরকম নেমে আসে মল্লারের ঢেউ
   তুমি কি গাইছ / নাকি, তোমাকেই গেয়ে ফেলেছে কেউ?

জন্মদিন এর কবিতাগুলি বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। একটা অনন্ত পথ পেরিয়ে সেই বরফই আবার জানলার ওপর থেকে বারেবারে নিচের দিকে ফিরে আসছে কিনা তুমি জানো না।
এইভাবে কবিতার টেলিশট দিয়ে বোঝানো সম্ভবপর নয়। কবিতার ছত্রে ছত্রে কবি আওড়ে গেছেন জীবনের আস্ত লিরিক। কবিতায় বহমানতা ধাবিত হচ্ছে দুরন্ত গতিময়তার দিকে। 

কবিতার ভাষার ব্যবহারের কথায় আসি। প্রথাসিদ্ধ জটিল ভাষার স্রোত থেকে সহস্র মাইল বিপরীতে হেঁটেছে কবি। সহজিয়া ভাষায় পাঠক কূলকে আকৃষ্ট করেছে নিশ্চিত ভাবে বলতে পারি। যে ভাষা আমাদের দৈনন্দিন। যার সাথে নিত্য জারিজুরি। খুব দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারি আষিকের এই কাব্যগ্রন্থ নতুন উদ্ভাসে-উদ্দীপনায় ভরপুর। কোথাও রিপিটেশন নেই কবিতাগুলোর মধ্যে ভাবনার। সবকটি স্বাতন্ত্র্য ভাবনার।

কবিতার বইখানি সত্যিই সংগ্রহণ যোগ্য। আমরা কবির কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ এই রকম একটি বই উপহার দেবার জন্যে। 

প্রথম প্রকাশঃ জানুয়ারি ২০১৫,  
সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী-বাগনান, হাওড়া, পৃষ্ঠাঃ ৮৮, মূল্যঃ ৮৯ টাকা                                                
ISBN 978-1-63415-169-6                                                 

সমালোচকঃ
পবিত্র আচার্য্য







জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

ঝিঁঝিরা... ডাক শোনা যায়

(বই নিয়ে আলোচনা  : 'ঝিঁঝিরা')
জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

আয়না কি শুধু চোখে দেখার জন্য রে পাগলা? অবিকল জনপ্রিয় ফিল্ম অভিনেতার গলায় কথাটা বলে তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে হাসতে শুরু করলেন। সারা ঘরের আয়নায় সিলিং থেকে ঝুলে পড়া স্যরেরা দুলে ওঠেন, পেন্ডুলামের মত দুলে চলেন।


গল্প হলেও সত্যি ছবিতে রুদ্রপ্রসাদ সেনগুপ্ত অভিনীত চরিত্রটি একটি শব্দ ব্যবহার করেছিল শকিউমেন্ট্রি (Shockumentary)। মনে আছে? ওপরের এই অংশটি পড়তে পড়তে ঠিক সেই শব্দটা মনে পড়ে গেছিল আমার। পাঠকের জন্যে এমনই এক একটা বাক্যে, অংশে... ছড়িয়ে রয়েছে শক। ওই চেতনার শকটা দরকার। বাংলা গদ্য এবং বাণিজ্যিক পত্রিকায় প্রচলিত গল্পগুলির মধ্যে সাহিত্যের এই ধারাটা ক্রমেই ম্লান হয়ে আসছে।  একটা ধারা হয়ে রয়ে গেছেন নবারুণ, থাকবেন। আর তারপরে সেই নবারুণ আলোতেই কাঁচা নর্দমার পাঁক ঘাঁটার সাহস দেখাবেন কেউ কেউ। তবে এইরকম শকিউমেন্ট্রি তৈরী করতে অনেকটা প্রয়াস লাগে... শ্রেফ অনুসরণ (বা অনুরূপ শব্দটি দিয়ে আসে না)। অবশ্য শক শোনা মাত্রই চমকে যাওয়া বা নেতিবাচক প্রভাবের চিন্তায় সতর্ক হয়ে ওঠার কিছু নেই। জীবনবিজ্ঞানের একাধিক পরীক্ষায় প্রমানিত, একাধিক প্রকারের থমকে যাওয়া জৈব প্রক্রিয়া এই রকম হালকা শক দিয়েই আবার চালু করতে হয়। ওই শকটা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে সেই পরিস্থিতিতে।

বইটি যখন কিনেছিলাম, গল্পের বই হিসেবেই কিনেছিলাম। তারপর পড়তে শুরু করলাম, প্রথম গল্প থেকেই। পড়তে পড়তে একসময় মনে হল... এখানে কোনও সীমানা নেই। গল্প গিয়ে মিশেছে গদ্যে... গদ্য গলে রূপ নিয়েছে কবিতার... বয়ে গেছে এক খাত থেকে আর এক খাতে। ঠিক জমির প্লটের মত মাপে মাপে গল্প নয়, এই লেখার প্রবাহ আছে। একটা ভেসে যাওয়া আছে। যেমন ধরা যাক, এই অংশটি-

সবাই এক এক করে নীচে নামছে। নামার পথটা ঘড়ির কাঁটার দিকে, তাই বেশ সংকীর্ণও । আমাদের সূর্য দেখা হয়নি, কুয়াশার কারণে, মেঘের কারণে। আমরা কুয়াশা দেখে ফিরছি এক এক করে। কুয়াশায় নেমে আসছি, মেঘে নেমে আসছি। নিজেদের মধ্যে নেমে আসছি।

এ কে পাঠক, গল্প বলে নির্দিষ্ট আধারে রাখতে পারলে, সে তাঁর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা বলব... আমি পারিনি।

এই রকম কথা-বাক্য-স্বপ্ন-অনুভবের ভেলাতে ভেসে যেতে যেতেই গানওলা থেকে নামহীন রুহ্‌... নামহীন রুহ্‌ থেকে খোয়াব খেকো... খোয়াব খেকো থেকে শেষ বলে কিছু নেই অবধি ভেসে যেতে হবে... বইয়ের পাতা উলটোতে উলটোতে। এমন কি, এক একটা লেখা (সব কটাকে আদৌ গল্প বলব কি না, সেই নিয়ে আমি নিজেই দ্বিধাভক্ত) দেখলে, তার নাম করনের মধ্যেও একটা শৈলীর স্পর্শ পাওয়া যায়। সেখানেও একটা বোধের প্রকাশ, আর একটা প্রশ্নের জন্ম দেওয়ার প্রয়াস দেখতে পাই। চিৎকার... যাকে ইংরেজী তে বলা যায় Screamচিৎকার গল্পটা পড়তে পড়তে একসময় তো সত্যিই শিল্পী এডভ্যাট মুঙ্ক (Edvard Munch)-এর 'The Scream ' কে জীবিত হয়ে উঠতে দেখা যায় বইয়ের পাতায়!

"প্রতিটা খবরের কাগজ বেঁচে থাকে একদিনের জন্য। সকাল থেকে সন্ধ্যের মধ্যে তার যৌবন, তারপর বেশ্যার প্রৌঢ়ত্ব।"

ঠিক এই ভাবেই, চিন্তার এক একটা স্তর প্রত্নতাত্ত্বিকের মত খনন করা হয়েছে এক একটা গল্পে। লেখিকা, চেয়েছেন, নিজের দেখাটাকে একজিবিট-এর মত স্পেসিমেন তুলে তুলে রাখতে পাঠকের সামনে। যাঁরা দেখতে চান, এবং এইরকম দেখার ইচ্ছে নিয়েই গল্পের মধ্যে জীবনকে খোঁজার চেষ্টা করেন। তাঁদের কাছে এই স্পেসিমেনগুলো খুব একটা হেলাফেলার জিনিস বলে মনে হবে না। খুব গম্ভীর, গভীর, মননশীল তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের ধারে কাছে না গিয়েও জীবন দর্শনের জাল যে কি সুন্দর কথা দিয়ে বোনা যায়, তা এমন লেখা পড়লে আবার করে চিনতে পারি... এইখানেই ভাল লাগা লেগে থাকে। এই স্তর থেকে স্তরে বিচরণ করতে করতেই কখনও প্রশ্ন আসে - মা বলেই ডাকে?কখনও ক্যামেরা টা ক্লোজ ইন হতে দেখায় -- কাঁচের দরজার ওপারে বিজলি গিরিয়ে আট বছরের রানির চোখ টেনে আটকে রেখেছেন চল্লিশজন শ্রীদেবী...

আবার কখনও এক শিক্ষক তার সূর্য কে বোঝায় -

আমরা হচ্ছি বাষ্পের মতো, সবসময় থিতু হয়ে যাই... থিতু হলে কী হয় জানিস? তরল হয়ে যাই আমরা, কাঁচের গায়ে, ঘাসের গায়ে জমি যাই, আর ওড়া হয়ে না আমাদের। তাই যখনই দেখবি বাষ্প জমছে, উড়িয়ে দিবি, ফুঁ দিয়ে সব উড়িয়ে দিবি।

সত্যিই বইটির সব কটা লেখা এক নিঃশ্বাসে শেষ করে ফেললাম বলা যায় না। কারণ এক নিঃশ্বাসে পড়ার নয়... পড়তে পড়তে কিছুক্ষন নিজের মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার মত লেখা। বাক্য সাজানোর মুনশিয়ানা এবং গল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া বিন্যাশও বেশ চোখে পড়ার মত... কিছু বাক্য রীতিমত উদ্ধৃতি দেওয়ার মত সুন্দর। তবে পড়তে পড়তে কিছু জিনিস বোঝা যায়, যেমন এক একটি লেখার সময় কালের মধ্যে, বা লেখিকার ভাবনার পরিণতরূপের মধ্যে একটা চড়াই-উতরাই আছে। সে ভাল কি খারাপ তা জানি না, তবে একটা গল্প থেকে আর একটা গল্পে যেতে গেলে এটাও হয়ত সচেতন পাঠককে ভাবাতে পারে। আবার এও বলব, বাংলা ভাষায় ডায়ালেক্ট-এর প্রয়োগ কিংবা সাব-অল্টার্ন ভাষার ব্যবহার যেখানে যেখানে... সেখানে আর একটু সচেতন ভাবে তা ব্যবহার করলে হয়ত অনেক বেশি রক্ত-মাংসের হয়ে উঠত চরিত্রগুলো।

যেখানে, একদিকে বেশ প্রতিষ্ঠিত নামগুলোকে ব্যানার করে বাণিজ্যিক পত্রিকাগুলোতে বাংলা ছোটগল্পকে সরল করতে করতে মেরে ফেলা হচ্ছে... সেই সময়ে মনে রাখার মত একটি প্রয়াসগুচ্ছের সম্ভার এই বই। ভাল খারাপ বলে আদৌ কোনও সৃষ্টিতে শীলমোহর বসানো যায় কি না আমার জানা নেই। আর তার উপায় থাকলেও, আমার সীমিত ক্ষমতার বাইরে। আমি কেবল আমার ভাল লাগা, আর আমার দেখা গুলো সকলের সঙ্গে ভাগ করে নিলাম।
আর হ্যাঁ, এত কথায় ভাসতে ভাসতে আসল কথাগুলোই বলা হয়নি... যে বইটির কথা বলছি এতক্ষণ, বইটির নাম ঝিঁঝিরা... লেখিকা অলোকপর্ণা (সৃষ্টিসুখ প্রকাশন থেকে প্রকাশিত, মূল্য - ৯৯ টাকা)।

পুনশ্চঃ বার বার পাঠক শব্দের ব্যবহার করায় পাঠিকারা রুষ্ট হলে... আমি আন্তরিক ভাবে মার্জনা চাইছি। ভাষার মধ্যে এই বৈষম্য রয়েছে... তার বশ্যতা স্বীকার করতে হয়েছে এই ক্ষেত্রে (শিকার হ'তে হয়েছেও বলা চলে)।